নিজস্ব প্রতিবেদক: স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৭ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) নামের সুবিচার করতে পারেনি। ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা গত ৪৮ বছরে শেয়ারকারসাজিসহ নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত হয়েছে। ব্যবসায়িকভাবেও অধিকাংশ সময় ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। এখনো রয়েছে। খেলাপি ঋণে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিবর্তন হয় কিন্ত ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল অবস্থার পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ আর্থিকভাবে দুর্বল, লোকসান থাকাই যেন প্রতিষ্ঠানটির নিয়মে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ঋণ খেলাপিগ্রস্ত আইসিবির প্রতি আমানকারীদের আস্থা, বিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আমানতকারীরা প্রতিষ্ঠানটিতে আমানত রাখতে ভয় পাচ্ছে। শুধু কি তাই? বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। যেকারণে বিনিয়োগকারীরাও প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী হিসাব বছরে (৩০ জুন ২০২৫) এককভাবে আইসিবির লোন বা ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদেরকে ঋণ দিয়েছে দুই হাজার ২৩ কোটি ১০ লাখ ৯১ হাজার ৪০৮ টাকা। যার মধ্যে ক্লাসিফায়েড লোন বা ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৫৪ কোটি ২০ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৫ টাকা। অর্থাৎ আইসিবির মোট বিতরণকৃত লোনের ৫৭ শতাংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।
(ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলে প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
অভিযোগ রয়েছে, স্বজন প্রীতি, উৎকোচ গ্রহণ ও নানারকম অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে তুলনামূলক আর্থিকভাবে দুর্বল গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে, যার দায়ভার নিতে হচ্ছে পুরো প্রতিষ্ঠানকে।
এদিকে গত হিসাব বছরে (৩০ জুন ২০২৪) এককভাবে আইসিবির ঋণ খেলাপির পরিমাণ ছিল ২৯৪ কোটি ৯১ লাখ ৫০ হাজার ২১০ টাকা। এক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে ৮৫৯ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার ৫৫ টাকা বা ২৯১ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির এই ঋণ খেলাপি আমানতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ১৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন আমানতকারীরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত হিসাব বছরে আইসিবির আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৮৮৯ কোটি ৪৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৫ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী হিসাব বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৯৭ কোটি ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫০ টাকা। বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে এক হাজার ৬৯২ কোটি ৪০ লাখ ৪ হাজার ৬৫ টাকা।

এদিকে নতুন করে আবারও প্রতিষ্ঠানটির কিছু অসাধু কর্মকর্তা শেয়ারকারসাজিতে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শেয়ারকারসাজি চক্রের সাথে যোগসাজস করে একাধিক অসৎ কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কারসাজি করছে।
জানা গেছে, গত সাত মাস ধরে আইসিবির শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে। ইতিমধ্যে কারসাজি চক্রটির সাথে হাত মিলিয়ে এসমস্ত অসৎ কর্মকর্তা শেয়ারটি উচ্চ দরে নিয়ে গিয়ে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করেছে এবং মার্কেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ মার্কেট থেকে বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত ১৯ মে ২০২৫ তারিখে আইসিবির শেয়ার দর ছিল ৪০ টাকা ৮০ পয়সা। আর গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৫৮ টাকা ৫০ পয়সা। আনুমানিক সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৭ টাকা ৭০ পয়সা বা ৪৩ শতাংশ। এরপর আজ (২১ ডিসেম্বর) শেয়ারটির দর নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ টাকা ৮০ পয়সা বা অর্থাৎ গত প্রায় সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর কমেছে ২১ টাকা ৭০ পয়সা বা ৩৭ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, পরিকল্পিতভাবে কারসাজি চক্রটির সাথে এসমস্ত অসাধু কর্মকর্তা যোগসাজস করে শেয়ারটির দর ৩৬ শতাংশ বাড়িয়ে কোটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এখন আবারও তারা কারসাজি শুরু করে দিয়েছি। গত ১৩ নভেম্বর শেয়ারটির দর ছিল ৩৪ টাকা ৯০ পয়সা। এই শেয়ারটির দর আবারও বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকার হাতিয়ে নেওয়ার পায়তারা করছে তারা।
এব্যাপারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শেয়ার কারসাজি চক্রটি ও এসমস্ত অসৎ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতিমধ্যে বেশি দামে শেয়ারটি কিনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়েছেন। তারা না পারছেন বিক্রি করতে, না পারছেন ধরে রাখতে।
এদিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিপরীতে সদ্য বিদায়ী বছরে আইসিবির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ৪ হাজার ৫০৫ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৬০১ টাকা। এই লোকসানের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে রেখেছে মাত্র এক হাজার ৪৬ কোটি ৫১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩১ টকা। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৩ হাজার ৪৫৯ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ৯৭০ টাকা, জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক।

এসব ব্যাপারে জানতে আইসিবির কোম্পানি সচিব রুকসানা ইয়াসমিন, মুখপাত্র ও উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুলাহ আল মামুন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, অনেক অনেক অর্থ রিসিভেবলস ছিল। বর্তমান অন্তরবর্তী সরকার রিসিভেবলসের একটা অংশ খেলাপি ঋণ হিসেবে কাউন্ট (হিসাব) করতে বলেছে। যে কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আইসিবি পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার না হলেও প্রতিষ্ঠানটির অনেক দায়বদ্ধতা রয়েছে। সরকার প্রতিষ্টানটি গঠন করেছে মূলত পুঁজিবাজারকে তারল্য সাপোর্ট (সহযোগিতা) দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি গত ৪৮ বছরেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। নিজেই ঋণের ভারে জর্জরিত। আর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শেয়ারকারসাজির অভিযোগ তো রয়েছে। অর্থাৎ রক্ষকেই যেন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিককালে সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে সামান্য পরিমাণ তারল্য সাপোর্ট দিয়েছে আইসিবি, যা চাহিদার তুলনায় অতি নগন্য। ধুকে ধুকে চলা এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এরচেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে রিফর্ম (পুনর্গঠন) করতে হবে। দক্ষ, সৎ, পরিশ্রমী জনবল নিয়োগ দিতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এবং বর্তমান যেসমস্ত কর্মকর্তা দুর্নীতি, অনিয়মের সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
উল্লেখ্য, আইসিবির পরিশোধিত মূলধন ৮৬৭ কোটি ২৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যেখানে বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ





















Recent Comments