নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে আলোচিত-সমালোচিত এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবসায়িক পারফর্মেন্স (কর্মদক্ষতা) মোটেই ভালো অবস্থায় নেই। ব্যাংকের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদকে নিয়োগ দিয়েও কোনো সুফল পাচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। ইতিমধ্যে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য, পেশাদারিত্বের অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ উঠেছে, যেমনটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ব্যাংকটির সাবেক পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ছিল।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটির ঋণ খেলাপি বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। শুধু কি তাই? ব্যাংকটির মূল চালিকা শক্তি আমানতের পরিমাণ কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকটির কার্যক্রম নিয়ে রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণ, ব্যাংকটির কার্যক্রম এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) এনআরবিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ হয়েছে দুই হাজার ২৮৩ কোটি ৬৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ টাকা। এর আগের বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৩) যা ছিল ৭৭৫ কোটি ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে এক হাজার ৫০৮ কোটি ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮৬ টাকা বা ১৯৪ শতাংশ।

এদিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটির প্রতি আমানতকারীদের আস্থা, বিশ্বাস ও আগ্রহ কমতে শুরু করেছে। বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের আমানত কমেছে ৩৭ শতাংশ।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের আমানতের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৮৭৪ কোটি ৮০ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৭ টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৩৮০ কোটি ৪৬ লাখ ৪ হাজার ৭৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে গ্রাহকদের আমানত কমেছে ৫০৫ কোটি ৬৫ লাখ ৫ হাজার ৬৫০ টাকা বা ৩৭ শতাংশ।

এমন পরিস্থিতিতে খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এনআরবিসির সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমালের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে। তিনি সেসময় ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন তিনি। এমন বাস্তবতায় গত ১২ মার্চ, ২০২৫ তারিখে বর্তমান অন্তরবর্তী সরকার ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদ (বোর্ড) ভেঙ্গে নতুন বোর্ড গঠন করে দেয়। কিন্তু নতুন বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়ার বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্যসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ ব্যাংকটির রক্ষকেই যেন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মধ্যখানে আমানত ও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকটি থেকে কাঙ্খিত সুফল না পেয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন। ব্যাংকটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলায় আমানতকারী আমানত রাখা কমিয়ে দিয়েছে। আর শেয়ারটি থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এদিকে নিরীক্ষক ব্যাংকটির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত বছর এনআরবিসি ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি হয়েছে ৯৪২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই ঘাটতি পূরণ করলে ব্যাংকটির নিট লোকসান হতো ৯৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। পাশাপাশি শেয়ারপ্রতি লোকসান হতো ১১ টাকা ৩৩ পয়সা।

অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে গত বছর এনআরবিসি ব্যাংকের প্রফিট বা মুনাফা কমেছে ৯৮ শতাংশ। উল্লেখিত বছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট প্রফিট হয়েছিল ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৬ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল একশো ৮৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩৩ হাজার ২৭৫ টাকা। বছরের ব্যবধানে নিট প্রফিট কমেছে ১৮০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৪৯ টাকা।

এসব ব্যাপারে জানতে এনআরবিসি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব (কারেন্ট চার্জ) মো. ফিরোজ আহমেদের সাথে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ঋদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রশ্ন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে রাখেন উত্তর দেবো। কিন্তু এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। এমনকি তিনি আর ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদকের ফোন রিসিভও করেননি।
প্রতিষ্টানটির ভাইস প্রেসিডেন্ড জাফর হাওলাদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো অফিসিয়ালি উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এনআরবিসি ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ আমরা লিখিত আকারে পাই, তবে অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংক খতিয়ে দেখবে। পাশাপাশি যদি অনিয়মের কোনো সত্যতা পাওয়া যায় তবে ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ব্যাংকটি আমাদের নজরে আছে।
উল্লেখ্য, এনআরবিসি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৮২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৪০ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা করেছে। সোমবার ব্যাংকটির শেয়ার দর ছিল ৫ টাকা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ





















Recent Comments