ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: ভালো কোম্পানি ভালো করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভালো কোম্পানি যদি খারাপ করে তবে তা অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তেমনই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি (এনসিসি) আগা-গোড়ায় ভালো কোম্পানি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও ২০২৪ সালে নন পার্ফমিং লোন (এনপিএল) বা মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রতিষ্ঠানটির। শুধু তাই নয়, ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালকদের বিশাল অঙ্কের বেতন-বোনাস বাড়ানো হলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে অস্বাভাবিক হারে আনরিয়েলাইজড লোকসান করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসততাও প্রকাশ করে। ভালোর অন্তরালে যত সমস্যা যেন এনসিসি ব্যাংকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রটি জানায়, বাজারে ইতিমধ্যে এনসিসি ব্যাংক ভালো কোম্পানির তকমা লাগিয়েছে। গত শনিবার (২৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক টেকসই রেটিং-এ দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যাংকের অন্যতম হিসেবে এনসিসি ব্যাংক সম্মাননা অর্জন করেছে, যা নিয়ে ব্যাংকটির মালিকপক্ষ থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আনন্দে ভাসছেন। কিন্তু ২০২৪ সালে কোম্পানিটি যে সাড়ে চারশো কোটি টাকার অধিক মন্দ ঋণের বেড়াজালে পড়েছে, যা আমানতকারীদের অর্থ; সেটি নিয়ে কারো যেন কোনো মাথা ব্যথা নেই।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে এনসিসি ব্যাংকের মন্দ ঋণের পরিমাণ ছিল এক হাজার ২৯৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭৫৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪৬৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে ৩৯২ কোটি ৬১ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৯ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এনসিসি ব্যাংকের, যার বর্তমান বাজার মূল্য ২৫২ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৯ টাকা। এক্ষেত্রে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১৩৯ কোটি ৭১ লাখ ৯৪ হাজার ২১০ টাকা।
স্পেশাল বা বিশেষ ফান্ডে কোম্পানিটির বিনিয়োগ রয়েছে ৭৩ কোটি ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৬৩ টাকা, যার বাজার মূল্য ৫৮ কোটি ৪১ লাখ ৪১ হাজার ৪৭০ টাকা। এক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১৫ কোটি ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৩ টাকা।
এছাড়াও বিভিন্ন মিউচ্যুয়াল ফান্ডে এনসিসি ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে ৩২ কোটি ৮৬ লাখ ২১ হাজার ৮৮৯ টাকা, যেগুলোর বর্তমান বাজার মূল্য ২২ কোটি ৬২ লাখ ৮৭ হাজার ১৭৬ টাকা। এক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ১০ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৩ টাকা।
এদিকে আনরিয়েলাইজড লোকসানে থাকা কোম্পানিটি এক বছরের ব্যবধনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস বাড়িয়েছে অস্বাভাবিক হারে।

২০২৩ সালে তাদের বেতন-বোনাস ছিল ৩৫৫ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪৮ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৯১ কোটি ৮২ লাখ ৩ হাজার ২৫৮ টাকা। বছরের ব্যবধানে বেতন-বোনাস বেড়েছে ৩৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৬১০ টাকা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখ অনুযায়ী কোম্পানিটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২ হাজার ৪৭৮ জন। সে-হিসেবে গড়ে ২০২৪ সালে প্রত্যেকে ১৫ লাখ ৮১ হাজার ১৯৬ টাকা করে বেতন বোনাস নিয়েছে। আর গড়ে প্রতি মাসে এক লাখ ৩১ হাজার ৭৬৬ টাকা করে তারা প্রত্যেকে বেতন-বোনাস নিয়েছে, যার মধ্যে অফিস সহকারী থেকে শুরু করে ব্যাংকের ঝাড়ুদারও রয়েছেন।
এছাড়াও ২০২৪ সালে পরিচালকদের ফিস বেড়েছে ১৫ লাখ ৮২ হাজার ৯৭৮ টাকা। ২০২৩ সালে তাদের ফিস ছিল ৩৯ লাখ ৯ হাজার ৭৭৯ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৫৫ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতার কারণে আনরিয়েলাইজড লোকসানে রয়েছে, অথচ ব্যাংকের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালকদের বেতন-বোনাস এভাবে বাড়ানো কতটা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, ২০২৩ সালে এনসিসি ব্যাংকের আদার অপারেটিং ইনকাম ছিল ১২৩ কোটি ৫ লাখ ৬২ হাজার ৫৭১ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ৮৬ লাখ ৫১ হাজার ২২৯ টাকা। বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৬ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার ৩৪২ টাকা।
এদিকে ২০২৩ সালে পেমেন্ট ফর আদার অপারেটিং একটিভিটিস ছিল ১৮১ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৬ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৪২ কোটি ৬৭ লাখ ৩৬ হাজার ৩১২ টাকা। বছরের ব্যবধানে তা কমেছে ৩৮ কোটি ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার ৭৪৪ টাকা।
আদার অপারেটিং ইনকাম যে পরিমাণ কমেছে তার চেয়ে পেমেন্ট ফর আদার অপারেটিং একটিভিটিস অনেক বেশি কমেছে। এব্যাপারে কমিশনের উচিত কোম্পানিটির ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করা, জানান বাজার বিশ্লেষকরা।
গত রবিবার (২৪ আগস্ট) ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের পক্ষ থেকে এসব ব্যাপারে জানতে ব্যাংকটির কোম্পানি সচিব মো. মনিরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কোনো উত্তর দিতে পারবো না। আপনি জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেইনের সাথে কথা বলেন। পরবর্তীতে আনোয়ার হোসেইনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদক প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামসুল আরেফিনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঢাকার বাহিরে আছেন বলে কোনো উত্তর দেননি। এরপর কয়েক দফা আনোয়ার হোসেইন ও শামসুল আরেফিনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তারা কোনো উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এনসিসি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে মন্দ ঋণ দেওয়া হয়েছে। যেগুলোর প্রভাব ব্যাংকটিতে পড়ছে। আমানতকারীদের অর্থ এভাবে ঋণ দিয়ে অন্যায় করেছে ব্যাংকটি। এসব মন্দ ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে ব্যাংকটির যারা যারা জড়িত ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ করা উচিত।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ব্যাংকগুলো এতোদিন প্রভাবিত হয়ে ঋণ খেলাপির চিত্র প্রকাশ করেনি। তবে এখন ঋণ খেলাপির সঠিক চিত্র ফুটে উঠছে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, গত বছরের (২০২৪) ৫ আগস্টের আগে এবং পড়ে অনেক শিল্পপতি, কারখানার মালিক বর্তমানে গা ঢাকা দিয়ে আছে। অনেকে বিদেশে চলে গেছে। যে-কারণে তাদের ফ্যাক্টরি বা কারখানার উৎপাদন ঠিকভাবে জেনারেট হচ্ছে না। ফলে তারা ব্যাংকের পাওনাও পরিশোধ করছে না। সে-কারণে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে অনেক ব্যাংক প্রভাবিত হয়ে ঋণ খেলাপির প্রকৃত চিত্র এতো দিন প্রকাশ করেনি। এখন যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার। তারা এক চুলও ছাড় দিচ্ছে না। সে-কারণে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঋণ খেলাপির চিত্র ফুটে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যাংক যদি অসৎ উদ্দেশ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস অতিরিক্ত দেখিয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই অন্যায় এবং তদন্ত হওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, এনসিসি ব্যাংকের মোট শেয়ার সংখ্যা ১১১ কোটি ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯৬টি; যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এছাড়াও উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৪১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে দশমিক ০৩ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments