শনিবার, ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভডিভিডেন্ড ইস্যু: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সাথে মোস্তফা মেটালের প্রতারণা
spot_img
spot_img

ডিভিডেন্ড ইস্যু: সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সাথে মোস্তফা মেটালের প্রতারণা

ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই প্ল্যাটফর্মের প্রকৌশল খাতের মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড বিনিয়োগকারীদের সাথে সরাসরি প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কম ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) প্রদান করেছে। এনিয়ে কোম্পানিটির প্রতি বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে বিরুপ মনোভাব বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে তালিকাভুক্ত হওয়া মোস্তফা মেটাল বিনিয়োগকারীদের আশা, আকাঙ্খা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। কোম্পানিটি ২০২১ সালের শেষে তালিকাভুক্ত হয়ে ২০২২ সালে বিনিয়োগকারীদের ৭ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড প্রদান করে। এরপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের বাদ দিয়ে যথাক্রমে ৩ ও ৪ শতাংশে ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ২০২৩ সালের ঘোষিত সামান্য ৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ডের পুরোটা বিনিয়োগকারীদের দেয়নি। ঘোষণা অনুযায়ী অনেক কম ডিভিডেন্ড দিয়েছে।

আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালের প্রদানকৃত ডিভিডেন্ড ২০২৪ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে মোস্তফা মেটাল। উদ্যোক্তা-পরিচালক বাদ দিয়ে কোম্পানিটির সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার সংখ্যা অনুযায়ী ৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড পাওয়ার কথা এক কোটি ৯০ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ডিভিডেন্ড প্রদান করেছে মাত্র ৩৯ লাখ ৮৭ হাজার ৩৮৪ টাকা। অর্থাৎ ডিভিডেন্ড হিসেবে ৬১ লাখ ৩ হাজার ১১৬ টাকা কম দিয়েছে।

কোম্পানিটির এমন আচরণে ক্ষুব্ধ প্রক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিনিয়োগকারী থেকে শুরু বাজার সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, কোম্পানিটি ঠিকমতো ডিভিডেন্ড প্রদান না করলেও ২০২৪ সালে ইনভেন্টরিজ বা কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্যের মজুদ বাড়িয়েছে। এতে করে বিশাল অঙ্কের টাকা অলস অবস্থায় পড়ে আছে।

আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ৪৭ কোটি ৫৬ লাখ ৮৪ হাজার ১৯ টাকার ইনভেন্টরিজ রয়েছে। এর আগের বছর যা ছিল ৩৮ কোটি ১৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ৯ কোটি ৩৮ লাখ ১৭ হাজার ৩২৭ টাকার মজুদকৃত পণ্যের পরিমাণ বেড়েছে।

কোম্পানিটি যেখানে পুরো ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকার পণ্য অলস ফেলে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এতে করে কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমিয়ে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রেমুনারেশন (সম্মানি) বাড়িয়েছে মোস্তফা মেটাল। ২০২৪ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমেছে ৯ লাখ ৭ হাজার ৪৭৫ টাকা। ২০২৩ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস ছিল ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ১৮৯ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭১৪ টাকা।

পরিচালকদের সম্মানি বেড়েছে ৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩ টাকা। ২০২৩ সালে তাদের সম্মানি ছিল ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ২৫৭ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়াও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও একজন ম্যানেজিং এজেন্টের ২০২৩ সালে সম্মানি ছিল ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ৩১৪ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৮ লাখ টাকা। বছরের ব্যবধানে তাদের সম্মানি বেড়েছে ২১ লাখ ৬৮৬ টাকা।

এদিকে সামান্য বেতনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস  কমিয়ে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সম্মানি বাড়ানোকে কোম্পানির দ্বৈতনীতির বহিঃপ্রকাশ বলছে বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, ২০২২ সালে মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছিল এক দশমিক ০৯ টাকা, ২০২৩ সালে ইপিএস হয়েছিল এক দশমিক ১৬ টাকা। আর ২০২৪ সালে ইপিএস এসে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক ২০ টাকা। অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে ইপিএস বেড়েছে দশমিক ১১ টাকা বা ১০ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীরা জানান, ইপিএস বাড়লেও মোস্তফা মেটাল ডিভিডেন্ড না বাড়িয়ে বরং দিন দিন কমাচ্ছে; যা কখনই কোম্পানিটির কাছে বিনিয়োগকারীরা আশা করেনি।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ মোস্তফা মেটাল ৯৮ লাখ ৩১ হাজার ৩৪৬ টাকার অ্যাসেটের ব্যবহার করেছে। আর ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ৬৬ হাজার ৭১৯ টাকা। বছরের ব্যবধানে অ্যাসেটের ব্যবহার কমেছে ৫৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬২৭ টাকা।

২০২৪ সালে অ্যাসেটের ব্যবহার কমলেও মুনাফা বেড়েছে। এতে করে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে বাজার সংশ্লিষ্টদের মনে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে গতকাল মঙ্গলবার (১২ আগস্ট) মোস্তফা মেটালের কোম্পানি সচিব মো. নাজমুল ইসলামকে ফোন করা হলে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকায় কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। এরপর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ নুরুজ্জামানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি একটি প্রশ্নের অর্ধেক উত্তর দেন। এরপর বাকি প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান মো. মামুন মুনশিকে ফোন করা হলে তিনি আজ (১৩ আগস্ট) অফিস সময়ে সিএফওকে ফোন করতে বলেন। এরপর আজ সিএফও কে ফোন করা হলে তিনি প্রশ্নগুলো মোস্তফা মেটালের ইমেইলে লিখিত আকারে পাঠাতে বলেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির ইমেইলে প্রশ্নগুলো পাঠানো হয়। কিন্তু প্রশ্নগুলোর উত্তর দেননি তিনি এবং চেয়ারম্যান ও সিএফও ডেইলি শেয়ারবাজারের এই প্রতিবেদকের আর ফোন রিসিভ (ধরা) করেননি।

এই বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ঘোষণা অনুযায়ী যদি ডিভিডেন্ড প্রদান না করে থাকে তবে মোস্তফা মেটালের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানিয়ে দেওয়া হবে, যেন সঠিক তদন্ত করে এব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ঘোষিত সম্পূর্ণ ডিভিডেন্ড বিনিয়োগকারীদের না দিয়ে মোস্তফা মেটাল অন্যায় করেছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রতিষ্ঠানটিকে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা উচিত। তাহলে অন্য কোম্পানিগুলো পরবর্তীতে এধরনের কাজ করতে পারবে না। আমাদের রেগুলেটরা এখনো শক্ত হতে পারেনি। রেগুলেটর শক্ত হলে কোম্পানিগুলো এধরনের অন্যায় করতে পারতো না। কমিশনকে শক্ত হতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, মোস্তফা মেটালের মোট শেয়ার সংখ্যা ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৫৫ হাজারটি; যারমধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৫৫ দশমিক ০৬ শতাংশ।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments