নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্রাউন সিমেন্ট নিজেকে সংশ্লিষ্ট খাতে সবচেয়ে দক্ষ কোম্পানি হিসেবে দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অথচ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের এই কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় তাদের দাবির সাথে বাস্তবতা মিল কতটুকু। ইতোমধ্যে সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে ৯৮ শতাংশ লোকসান করেছে ক্রাউন সিমেন্ট। আর মুনাফা কমেছে ৩৩ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানটির দাবির সাথে একমত নন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি যদি দক্ষই হতো তাহলে সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে এরকম লোকসান করতো না। এছাড়াও বিনিয়োগকারীদের অর্থ এভাবে তছরুপ করতো না। কোম্পানিটির দক্ষতা ও সততায় যথেষ্ঠ ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তারা।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলেন, দিনকে দিন ক্রাউন সিমেন্টের পারফর্মেন্স (কর্মদক্ষতা) দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে একাধিক সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিনিয়োগ করে উল্লেখযোগ্য হারে লোকসান করেছে। ফলে দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। শুধু তাই নয়, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রফিট বা মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
জানা গেছে, ক্রাউন সিমেন্টের ম্যানেজমেন্ট নিজেদেরকে সংশ্লিষ্ট খাতে সবচেয়ে দক্ষ বলে দাবি করে। অথচ একই খাতের আরেক কোম্পানি কনফিডেন্স সিমেন্ট, যে নিজের ম্যানেজমেন্টকে কখনোই সর্বোচ্চ দক্ষ বলে দাবি করেনি, সেই প্রতিষ্ঠানও ক্রাউন সিমেন্টের চেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রাউন সিমেন্টের ব্যবসার পলিসি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) ক্রাউন সিমেন্ট মুনাফা করেছে ৬৭ কোটি ১৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩৭৪ টাকা। এর আগের বছর (৩০ জুন ২০২৪) যা ছিল একশো কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার ২৪৪ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে ৩২ কোটি ৯৮ লাখ ১৬ হাজার ৮৭০ টাকা বা ৩৩ শতাংশ।
অপর দিকে গত বছরের তুলনায় সদ্য বিদায়ী বছরে কনফিডেন্স সিমেন্টের মুনাফা বেড়েছে ২১ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬৭ টাকা বা ২৯ শতাংশ।

এ ব্যাপারে লিখিত বক্তব্যে ক্রাউন সিমেন্টের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, অবচয় ৩৮ কোটি, ব্র্যান্ডি খরচ ১৭ কোটি এবং সুদ খরচ ১৩ কোটি টাকা বাড়ার কারণে নিট প্রফিট কমেছে।
অথচ নানারকম সীমাবদ্ধতার মাঝেও ঠিকই মুনাফা বৃদ্ধি করেছে কনফিডেন্স সিমেন্ট। তাই ক্রাউন সিমেন্টের মুনাফা আদৌ কমেছে কিনা তা তদন্ত করা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে সহযোগি প্রতিষ্ঠান ক্রাউন ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড লজিস্টিকস লিমিটেডে বিনিয়োগের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩০ টাকা। আর লোকসান করেছে এক কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ৩৯০ টাকা। অর্থাৎ লোকসান করেছে ৯৮ শতাংশের বেশি। এছাড়াও আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান ক্রাউন পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডে বিনিয়োগ করে গত দুই বছরে ধরে লোকসান করে যাচ্ছে। গত বছর লোকসান করেছে ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার ২০৪ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে লোকসান করেছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৭ টাক। অর্থাৎ গত দুই বছরে মোট লোকসান করেছে ৫৯ লাখ ৬২ হাজার ৪৮১ টাকা।

লোকসানের কথা স্বীকার করে চেয়ারম্যান বলেন, সদ্য বিদায়ী বছরে ক্রাউন পাওয়ার জেনারেশন গ্যাস সাপ্লাই সংকটের কারণে অপারেশেন চালাতে পারেনি বিধায় লোকসান করেছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, গ্যাস সংকটের মাঝেই অনেক কোম্পানি ভালো করছে তাহলে ক্রাউন সিমেন্ট কেনো ভালো করছে না। বিষয়টি খুঁজে বের করা দরকার।
এদিকে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ও ম্যানেজমেন্টের যে দক্ষতা ও সততার যথেষ্ট অভাব রয়েছে তা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সদ্য বিদায়ী বছরে ক্রাউন সিমেন্টের আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে এক কোটি ১২ লাখ দুই হাজার ৮৬৯ টাকা। এর আগের বছর লোকসান হয়েছিল ৯৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০৩ টাকা। বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৩৬৬ টাকা।

এছাড়াও সদ্য বিদায়ী বছরে ক্রাউন সিমেন্টের সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন এক্সপেনসেস বেড়েছে ৫৮ কোটি ৫১ লাখ ৯৭ হাজার ৮১৫ টাকা বা ৭৪ শতাংশ।
এব্যাপারে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানায়, সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানির রেভিনিউ বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এই রেভিনিউ বৃদ্ধির জন্য সেলিং, ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং, ডিষ্ট্রিবিউশন খরচ বেড়েছে। যাহা ছাড়া রেভিনিউ গ্রোথ সম্ভব ছিল না।
খাত সংশ্লিষ্ঠরা অভিযোগ করে বলেন, রেভিনিউ বৃদ্ধি হয়েও তো কোনো লাভ হয়নি। কারণ কোম্পানিটির রেভিনিউ বৃদ্ধি পেলেও মুনাফা কমেছে। বরং সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন এক্সপেনসেস কমিয়ে যদি রেভিনিউ একটু কমও হতো এবং মুনাফা যদি বাড়ানো যেত তাহলে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারতো প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজমেন্ট। কিন্তু সেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, অনেক সময় নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য প্রফিট হলেও লোকসান দেখিয়ে থাকে অনেক কোম্পানি। এক্ষেত্রে ক্রাউন সিমেন্ট তার সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে আসলেই লোকসান করেছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদার ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, একটি লিস্টেড (তালিকাভুক্ত) কোম্পানি তার সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার আগে দেখতে হবে সেটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান কিনা। যদি লাভজনক প্রতিষ্ঠান না হয় এবং জেনেশুনে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে তবে, এর দায়ভার যে কোম্পানি বিনিয়োগ করবে তার। বিশেষ করে তার ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের। কারণ জেনে বুঝে লোকসানি কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ তছরুপ করার অধিকার তার নেই।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ক্রাউন সিমেন্টের পরিশোধিত মূলধন ১৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৪৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ





















Recent Comments