নিজস্ব প্রতিবেদক: নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা ও শ্রম আইন অমান্য করে বহাল তবিয়তে আছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেড। এব্যাপারে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।
বিএসইসির নির্দেশনা অনুসারে তিন বছর বা তার অধিক সময় ধরে কোম্পানির কাছে থাকা আনক্লেইমড ডিভিডেন্ড (অবণ্টিত লভ্যাংশ) কেপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) জমা দিতে হয়। এক্ষেত্রে ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেডের কাছে তিন বছরের অধিক সময় ধরে অবণ্টিত লভ্যাংশ ৮৬ লাখ ১১ হাজার ৪০২ টাকা রয়েছে। কিন্তু কোম্পানিটি সিএমএস ফান্ডে এই অর্থ জমা দেয়নি। ফলে সরাসরি কোম্পানিটি বিএসইসির নির্দেশনা অমান্য করেছে, জানিয়েছে কোম্পানিটির নিরীক্ষক।

কোম্পানিটির নিরীক্ষক জানিয়েছে, কোম্পানিটি তার আর্থিক প্রতিবেদনে অবণ্টিত লভ্যাংশ এক কোটি ৮৪ লাখ ২৯ হাজার ৬৩২ টাকা উল্লেখ করেছে। কিন্তু কোম্পানিটির লভ্যাংশ সংক্রান্ত হিসাবে মাত্র ৪৩ হাজার ৪৭৭ টাকা রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে এক কোটি ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ১৫৫ টাকা।

সাধারণ বিনিয়োগকারী অভিযোগ করে বলেন, এক কোটি ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ১৫৫ টাকা লভ্যাংশ সংক্রান্ত হিসাবে জমা না রেখে আত্মসাৎ করেছে ভিএফএস থ্রেড। এই অর্থ আত্মসাতের সাথে কারা কারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
(ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
এদিকে নিরীক্ষক আরও জানিয়েছে, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) জন্য ৫ কোটি ২৯ লাখ ৬১ হাজার ৯৮৮ টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২৩৪ অনুসারে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড, ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড এবং লেবার ওয়েলফেয়ার ফাউন্টেশন ফান্ডে যথাক্রমে ৮০:১০:১০ অনুপাতে অর্থ বরাদ্দ রাখেনি কোম্পানিটি।

জানা গেছে, ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান করা ভিএফএস থ্রেড সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) শুধুমাত্র সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মাত্র দশমিক ২৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এনিয়ে কোম্পানিটির ডিভিডেন্ডের এমন বেহাল দশায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা রীতিমত চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়িকভাবে বেশ খারাপ অবস্থায় থাকা কোম্পানিটির সদ্য বিদায়ী বছরে রেভেনিউ বা বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৩৭ শতাংশ। গত হিসাব বছরে (৩০ জুন ২০২৪) ভিএফএস থ্রেডের বিক্রয় রাজস্ব হয়েছে ৪২ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ৯৮০ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী হিসাব বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি দুই লাখ ৫৩ হাজার ৬৮৪ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৬ টাকা।

এছাড়াও সদ্য বিদায়ী বছরে ভিএফএস থ্রেডের নিট প্রফিট বা মুনাফা কমেছে ৭৩ শতাংশ। গত হিসাব বছরে মুনাফা হয়েছে তিন কোটি ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৩ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে দুই কোটি ৫৩ লাখ ১৬ হাজার ১২৬ টাকা।
এসব ব্যাপারে জানতে ভিএফএস থ্রেড ডাইং লিমিটেডের সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) রাসেলকে ফোন করা হলেও তিনি প্রশ্নসমূহ তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠাতে বলেন। পরবর্তীতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে পাঠানো হলেও কোনো প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. আজহার রহমানকে ফোন করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ভিএফএস থ্রেড পুঁজিবাজারে আসছেই মূলত বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য। এই ধরনের বাজে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর। কোম্পানিটির সামগ্রিক বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বিএসইসির নির্দেশনা ভিএফএস থ্রেড অমান্য করেছে কিনা পাশাপাশি কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করেছে কিনা আমরা তা খতিয়ে দেখে খুব শিগগিরই ব্যবস্থা নেবো।
উল্লেখ্য, ভিএফএস থ্রেডের অনুমোদিত মূলধন ১০৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যেখানে উদ্যোক্তা পরিচালকদের (পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারী ব্যতিত) মালিকানা রয়েছে ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
























Recent Comments