নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি ব্যবসায়িকভাবে দিন দিন খাদের কিনারে চলে যাচ্ছে। আমানতকারীরাও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যে-কারণে প্রতিনিয়ত ব্যাংকটি থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এমন অবস্থা চলতে থাকলে খুব শিগগিরই ব্যাংকটির দেওলিয়া হওয়ার সম্বাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের ছত্রছায়ায় ছিল মার্কেন্টাইল ব্যাংক। কিন্তু আওয়ামীলীগ সরকার পদত্যাগ করার পর থেকেই ব্যাংকটির দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে। গত নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) আমানতকারীদের আমানত আশঙ্কাজনকহারে কম এসেছে। এছাড়াও একই সময়ে প্রফিট বা মুনাফা কমেছে শত কোটি টাকার বেশি। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকটির ভিতরে-বাহিরে চলছে অস্থিরতা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বিদায়ী বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর, ২০২৫) ব্যাংকটিতে আমানতকারীদের আমানত এসেছে ১৫৯ কোটি ৯৫ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৮ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৫৩৬ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৬০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে এক হাজার ৩৭৬ কোটি ৫৭ লাখ ৩৬ হাজার ২৯২ টাকা বা ৯০ শতাংশ।
(মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলে দ্বিতীয় পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে তৃতীয় পর্ব।)
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিদায়ী বছরের প্রথম নয় মাসে আমানত ৯০ শতাংশ কম আসা মোটেও হালকা বিষয় নয়। ব্যাংকটির প্রতি মানুষের যে আস্থা, বিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তার বহি:প্রকাশ ঘটেছে এই আমানতে। মানুষ আর ব্যাংকটিতে অর্থ রাখতে নিরাপত্তাবোধ করছে না। আমরা অনেকেই জানি সর্বশেষ হিসাব বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) ব্যাংকটির ঋণ খেলাপি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সেই ভয় থেকেই আমানতকারীরা ব্যাংকটি থেকে মারাত্মকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে প্রফিট কমেছে ৩৮ শতাংশ। বিদায়ী বছরের প্রথম নয় মাসে নিট প্রফিট হয়েছে ২০৭ কোটি ৭৯ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৩ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৩৭ কোটি দুই লাখ ৯২ হাজার ১৭৪ টাকা। এক্ষেত্রে নিট প্রফিট কমেছে ১২৯ কোটি ২২ লাখ ৯৯ হাজার ১৮১ টাকা।

এছাড়াও এক বছরের ব্যবধানে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আদার অপারেটিং ইনকাম (অন্যান্য পরিচালনা আয়) কমেছে ৬৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা বা ৩৮ শতাংশ।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নিট প্রফিট ও অন্যান্য পরিচালনা আয় ৩৮ শতাংশ করে কমে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের ১০ কোটি ১৭ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৭ টাকা বেশি প্রদান করা হয়েছে একই সময়ে। অর্থাৎ ব্যাংকের করুণ পরিণতিতে বিনিয়োগকারীরা সর্বশান্ত হলেও কর্মীরা রযেছেন আনন্দ ফূর্তিতে। অর্থাৎ কর্মীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃতি না হলেও প্রতিষ্ঠান তাদেরকে দু হাত ভরে দিয়েছে। আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করে কর্মীদেরকে এই অর্থ দিয়েছে ব্যাংকটি।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী বছরের প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটি তার কর্মীদের অর্থ প্রদান করেছে ৩১৭ কোটি ৪১ লাখ ৮০ হাজার ৫৮১ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০৭ কোটি ২৪ লাখ ২১ হাজার ৪৪৪ টাকা। বছরের ব্যবধানে কর্মীদের ৩ শতাংশ অর্থ বেশি প্রদান করা হয়েছে।

এদিকে নিরীক্ষক জানিয়েছে, সর্বশেষ হিসাব বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি হয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। উল্লেখিত বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস অনুসারে কোম্পানিটির প্রভিশনের প্রয়োজন ছিল তিন হাজার ৮১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যাংক প্রভিশন রেখেছে দুই হাজার ১১৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
চরম তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকটি প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে পারেনি বলে মত প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এসব ব্যাপারে জানতে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সচিব মোহাম্মদ রেজাউল করিমকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয় আমি কিছু বলতে পারবো না। আমাদের মুখপাত্রের সাথে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতের ব্যাংকের মুখপাত্র অসিম কুমার সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ব্যাংকটির কেন ডিপোজিটের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে তা আমার জানা নেই। তবে ব্যাংকটি আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সমাপনী দর ছিল ৭ টাকা ৭০ পয়সা। কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ১০৬ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতিত) মালিকানা রয়েছে ৬৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments