বৃহস্পতিবার, ২৬শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeঅর্থনীতিঅনুমোদিত সীমার প্রায় পাঁচ গুণ সিস্টেম লস তিতাসে
spot_img
spot_img

অনুমোদিত সীমার প্রায় পাঁচ গুণ সিস্টেম লস তিতাসে

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ নেটওয়ার্কে গত পাঁচ অর্থবছরে হিসাবের বাইরে চলে গেছে ৪০৯ কোটি ঘনমিটার গ্যাস। এই গ্যাসের পরিমাণ বাংলাদেশে আমদানি করা প্রায় ৪৫ থেকে ৪৮টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গোর সমান। অর্থাৎ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ কার্গো এলএনজির সমপরিমাণ গ্যাস সিস্টেম লস হিসেবে হারাচ্ছে তিতাস।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়ায় এই সিস্টেম লসের আর্থিক ক্ষতিও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের প্রভাবে গত কয়েক মাসে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিপি সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেডের কাছ থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলার ৩ সেন্ট দরে এক কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে এক কার্গো এলএনজির দাম দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে ১০ কার্গো এলএনজির মূল্য প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অনুমোদিত সিস্টেম লসের সীমা ২ শতাংশ। তবে তিতাসে এই হার কয়েক গুণ বেশি। বরং সিস্টেম লস কমাতে নিয়মিত অভিযান ও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গত তিন অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

তিতাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সিস্টেম লস ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। ওই বছর ৮১ কোটি ঘনমিটার গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যায়, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিস্টেম লস বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে। এ সময় ১২০ কোটি ঘনমিটার গ্যাসের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা।

পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে সিস্টেম লস আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে পৌঁছায়। ওই অর্থবছরে ১৪৪ কোটি ঘনমিটার গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যায়, যার মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। বিইআরসির অনুমোদিত ২ শতাংশের তুলনায় এই হার প্রায় পাঁচ গুণ।

গত পাঁচ অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস হওয়া গ্যাসের মোট আর্থিক মূল্য প্রায় ৮ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। এর ফলে একদিকে কোম্পানিটির আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

দেশে প্রতিদিন গড়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উৎপাদন ও দুটি এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর দৈনিক গড়ে ২৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিতাসের সিস্টেম লস হওয়া ১৪৪ কোটি ঘনমিটার গ্যাসকে দৈনিক হিসাবে ধরলে প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দৈনিক সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল।

তিতাস বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ-এই ১২ জেলায় গ্যাস বিতরণ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পাইপলাইন নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ৪৩৮ কিলোমিটারের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে তিতাসের গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৭৯ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ২৭ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি।

দেশের গ্যাস বিক্রয় বাজারের প্রায় ৫৫ শতাংশ তিতাসের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ হাজার ৩৭২ কোটি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি করেছে। ওই অর্থবছরে তিতাসের আয় ছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বিপরীতে সিস্টেম লসের পরিমাণ ছিল ১৪৪ কোটি ঘনমিটার।

তিতাসের বার্ষিক প্রতিবেদনে সিস্টেম লসকে কোম্পানিটির আর্থিক দুরবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সিস্টেম লসের কারণে যে পরিমাণ গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হয়নি, তার আর্থিক দায়ও কোম্পানির ওপর পড়ছে।

তিতাসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সিস্টেম লসের পেছনে মূলত দুটি কারণ রয়েছে । এক পাইপলাইনের লিকেজ ও দুই গ্যাস চুরি। তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, পুরনো পাইপলাইনের কারণে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ গ্যাস লিকেজ হচ্ছে। এসব পাইপলাইন প্রায় পাঁচ দশক আগে স্থাপন করা হয়েছিল। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে গ্যাস চুরির প্রবণতা বেশি।

গ্যাস চুরি বন্ধে তিতাস নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগে অন্তত ৩৬টি চুন কারখানার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তবে অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি চুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও গ্রাহকদের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছে তিতাস।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে তিতাস প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার অবৈধ আবাসিক সংযোগ এবং ৫৭৬টি বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বার্নার ও পাইপলাইনও অপসারণ করা হয়। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় অভিযান ও সংযোগ বিচ্ছিন্নের সংখ্যা কমেছে। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর একই এলাকায় আবারও সংযোগ স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিমের মতে, প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সিস্টেম লস হচ্ছে, যার বড় অংশই চুরি। তিনি বলেন, এ ধরনের ক্ষতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শুধু অভিযান পরিচালনা করে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস চুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। চুরির পেছনে যে অর্থনৈতিক সুবিধা কাজ করছে, সেটিও কমাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইপলাইনের গ্যাস ও এলপিজির দামের বড় পার্থক্য অবৈধ সংযোগের অন্যতম কারণ। তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ায় পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহারে গ্রাহকদের আগ্রহ বেশি। এ কারণে বাসাবাড়িতে মিটারভিত্তিক গ্যাস সংযোগ এবং ধীরে ধীরে গ্যাসের মূল্য কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

তিতাসের প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কিলোমিটার নেটওয়ার্কের অনেক পাইপলাইন ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরনো। দীর্ঘদিনের ক্ষয়, মাটির নিচে অতিরিক্ত গভীরে চলে যাওয়া এবং বিভিন্ন সংস্থার অবকাঠামো নির্মাণের সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সিস্টেম লস বাড়াচ্ছে। তবে শুধু পুরনো পাইপলাইন দিয়ে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ সিস্টেম লসের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গ্যাস চুরিও এর অন্যতম বড় কারণ।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের সিস্টেম লসের হারও বেশি। পাকিস্তান আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঁচ বছরে সিস্টেম লস ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। অন্যদিকে ভারতে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস সাধারণত ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো পাইপলাইন সংস্কার, আধুনিক মিটারিং ব্যবস্থা, ডিজিটাল নজরদারি, অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা এবং গ্যাসের মূল্য কাঠামোর সংস্কার—এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হলে একই সঙ্গে গ্যাস আমদানির চাপ কমবে, শিল্পে সরবরাহ বাড়বে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে পুরনো পাইপলাইন ও অবৈধ সংযোগের বিষয়টি বিবেচনায় তিতাস ও বাখরাবাদের ক্ষেত্রে সিস্টেম লস সর্বনিম্ন ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে তিতাসের কার্যক্রমকে ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে চারটি অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, সিস্টেম লস কমাতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে তিতাসের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিতাসের বিভিন্ন বিরোধের বিষয়েও দ্রুত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আবার আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments