নিজস্ব প্রতিবেদক: ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করা কোম্পানিটির রেভেনিউ বা বিক্রয় রাজস্ব যেমন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, তেমনি কমেছে প্রফিট বা মুনাফাও। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, আসলেই কি কোম্পানিটির মুনাফা কমেছে নাকি তার অন্তরালে ভিন্ন কিছু রয়েছে? ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডেও সুশাসনের অভাব দেখা দিয়েছে, যেমনটি রয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত অসংখ্য কোম্পানিতে। তাই কোম্পানিটির বিষয়ে সঠিক তদন্ত করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।
এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেড ব্যবসা সম্প্রসারণে সম্প্রতি বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রায় হাত গুটিয়ে থাকা কোম্পানিটির (প্রাইস/আর্নিংস) পিই রেশিও-ও সন্তোষজনক নয়। এছাড়াও সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করা হয়েছে বলেও আশঙ্কা করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টররা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ১৪ শতাংশ। আর মুনাফা কমেছে ৩১ শতাংশ।
জানা গেছে, গত হিসাব বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের বিক্রয় রাজস্ব হয়েছে ৩৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। এর আগের বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৩) যা ছিল ৩৯৫ কোটি ৪২ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৫৭ কোটি ৯ লাখ ৪ হাজার টাকা।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, গত হিসাব বছরে কোম্পানির নিট প্রফিট হয়েছে ৬৬ কোটি ৭২ লাখ ৮ হাজার টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল ৯৬ কোটি ১৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বছরের ব্যবধানে নিট প্রফিট কমেছে ২৯ কোটি ৪৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
(ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার নিয়ে সাত পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
কোম্পানিটির মুনাফা কমে যাওয়ার বিষয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) সঠিক তদন্ত করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বিনিয়োগকারীরা। তারা বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নাজুক। লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং হচ্ছে এর মাঝে কোম্পানিগুলো মুনাফা করেও মুনাফা কম দেখাচ্ছে। তেমনি এই কোম্পানিটি একই কাজ করছে কিনা তা সঠিক তদন্ত করা উচিৎ। নয়তো দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে, কোম্পানিটির এই মুনাফা কমে যাওয়াকে সুশাসনের ঘাটতি হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গত হিসাব বছরে ইউনিলিভার নামের সুবিচার করতে পারেনি। কোম্পানিটির এই মুনাফা কমে যাওয়াতে কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে কিনা তা তদন্ত সাপেক্ষে খুঁজে বের করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। খাত সংশ্লিষ্টদের ধারণা সম্প্রতি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের শেয়ার নিয়ে কারসাজিকারকরা কারসাজি করেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত পহেলা সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল দুই হাজার ৫২২ টাকা ৫০ পয়সা। এর আগে গত ২৫ মে ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল দুই হাজার ১১৫ টাকা। আনুমানিক তিন মাসের ব্যবধানে কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে ৪০৭ টাকা ৫০ পয়সা।
এদিকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার এসে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২১৫ টাকা ৮০ পয়সা। অর্থাৎ গত পাঁচ মাসে ( পহেলা সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ৩০৬ টাকা ৭০ পয়সা।
গত নয় মাসে কোম্পানির শেয়ার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গিয়ে তা আবার প্রায় একই হারে কমে যাওয়াকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না সাধারণ খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণা, কারসাজিকারকরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বোকা বানিয়ে শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রি বাবদ নগদ অর্থ প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে ১৪ শতাংশ। গত হিসাব বছরে কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ পেয়েছে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৩৯৪ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির নগদ অর্থ প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে ৫৬ কোটি ২৬ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসা সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার। গত হিসাব বছরে প্ল্যান্ট অ্যান্ড মেশিনারি বাবদ মাত্র ৪ হাজার টাকা ব্যয় করেছে কোম্পানিটি। এর আগের বছর যা ছিল ৫ কোটি ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্ল্যান্ট অ্যান্ড মেশিনারি বাবদ ব্যয় কমেছে ৫ কোটি ২৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা বা ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
এদিকে প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। গত ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসানের আদালত মামলার শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আওতায় আসা কর্মকর্তারা হলেন- ইউনিলিভার বাংলাদেশের সেন্ট্রাল সাউথ ক্লাস্টার প্রধান সৈয়দ জিকরুল বিন জমির, ওয়ারীর সিনিয়র টেরিটরি ম্যানেজার এম সোয়াইব কামাল, সেন্ট্রাল সাউথ রিজিওনের এরিয়া ম্যানেজার কাওসার মাহমুদ চৌধুরী, কনজুমার কেয়ারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ নাহারুল ইসলাম মোল্লা এবং ফাইন্যান্স ডিরেক্টর জিন্নিয়া হক।
বাদীপক্ষের আইনজীবী জাহিদুল ইসলাম হিরণ জানান, প্রতারণা ও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে গত বছরের ৭ আগস্ট ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিবেশক ‘মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স’ এই মামলাটি দায়ের করে। আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্ত করে সিআইডি। তদন্ত কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম গত ৫ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
মামলা ও তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যে জানা যায়, ২০০৯ সালের ৩ নভেম্বর ওয়ারী, মানিকনগর, সদরঘাট, নবাবপুর রোড, মালিবাগ, শ্যামপুর ও মতিঝিল এলাকায় ইউনিলিভারের পরিবেশক হিসেবে ‘মাসুদ এন্ড ব্রাদার্স’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাদী প্রতিষ্ঠান লাক্স, ডাভ, সানসিল্ক, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলিসহ ইউনিলিভারের ২৫০টির বেশি পণ্য নির্ধারিত এলাকায় বাজারজাত করত। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি চুক্তি নবায়ন করা হয়।
পরিবেশক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাদী প্রতিষ্ঠান গোডাউন ভাড়া, পরিবহন ব্যবস্থা ও জনবল নিয়োগসহ বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে সরবরাহ করা পণ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ নষ্ট, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ড্যামেজড পণ্য ইউনিলিভারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব পণ্যের পরিবর্তে নতুন পণ্য সরবরাহ বা অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বারবার তাগাদা সত্ত্বেও তা করা হয়নি। এতে বাদী প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। পাশাপাশি অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, অবাস্তব বিক্রয় লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বাজারে কম বিক্রিত পণ্যের অতিরিক্ত সরবরাহের মাধ্যমে বিক্রয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করা হয়, যার ফলে ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করে নতুন পরিবেশক নিয়োগের মাধ্যমে আসামিরা মোট ৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি সাধন করেছেন।
এ ছাড়া বাদী প্রতিষ্ঠানকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পাঁচ কর্মকর্তা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা, অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ ও ভয়ভীতির মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন— এমন প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সুপারিশ করা হয়।
গতকাল (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি সচিব শারমিন আক্তারের সাথে এসব ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আজকে (১৫ ফেব্রুয়ারি) আমরা সবাই ব্যস্ত আছি। আগামীকাল (আজ) অফিস আওয়ারের মধ্যেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন। কিন্তু অফিস আওয়ার শেষ হয়ে গেলেও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল হক ডেইল শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের ব্যবসা অনেক ভালো। কোম্পানির মালিকপক্ষ মুনাফার একটি অংশ নিজেদের পকেটে রেখেছে। এবং তুলনামূলক কম মুনাফা দেখিয়েছে। এব্যাপারে তদন্ত হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।























Recent Comments