
পুঁজিবাজারে কোম্পানির ভালো-মন্দ ব্যবসায়ীক খবরের উপর ভিত্তি করে শেয়ারের চাহিদা বাড়ে বা কমে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজার যেন উল্টো রথের এক পুঁজিবাজার। এখানে শেয়ারের দাম বাড়লে কোম্পানির আয় বেড়ে যায়, আর শেয়ারের দাম কমে গেলে কোম্পানির আয় কমে যায়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে যে সকল কোম্পানি দীর্ঘ দিন থেকে ভালো ব্যবসা করে আসছে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত, লক্ষ করলে দেখবেন সে সকল কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা নেই। পুঁজিবাজারের ইনডেক্স বাড়লে ভালো কোম্পানি গুলোর দাম কিছুটা বাড়লেও ইনডেক্স কমার সাথে সাথে ভালো কোম্পানি গুলোর দাম যেন আরও অধিক হারে কমে যায়। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ঐ সকল কোম্পানির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায় যেগুলোর পেছনে রয়েছে অসৎ উদ্দেশ্য।
এই অসৎ উদ্দেশ্য অনেক ধরনের হতে পারে যেমনঃ দাম বৃদ্ধি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে তাদের হাতে শেয়ার ধরিয়ে দেয়া, হতে পারে দাম বৃদ্ধি করে শেয়ার মর্টগেজ রেখে বিপুল পরিমাণ লোন ব্যাংক থেকে বের করে নেওয়া। আর এই অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পেছনের সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে দুর্বল কোম্পানি গুলোর অসৎ মালিকপক্ষ।
নিম্নে গত ১ বছরে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সর্বোচ্চ দাম বৃদ্ধি পাওয়া শেয়ার গুলো কতটুকু অসঙ্গতিপূর্ণ তা তুলে ধারার চেষ্টা করছিঃ-
❍ বেক্সিমকো লিমিটেডেঃ ২০০০ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত এই কোম্পানির শেয়ারের EPS কখনও ৩ টাকায় উপরে ছিল না। কিন্তু ২০১০ সালে শেয়ারের দাম ৩৫ টাকা থেকে যখন ৫০০ টাকা চলে গেল তখন এর EPS ৪০ টাকা হয়ে গেল। আবার শেয়ারের দাম কমতে কমতে যখন ১২ টাকা চলে আসলো তখন এর EPS .৫২ পয়সা হয়ে গেল। বেক্সিমকো লিমিটেডের বিগত ৭ বছরের EPS রেকর্ডঃ- ২০১৩ সালে .৬৮ পয়সা, ২০১৪ সালে ১.০৬ টাকা, ২০১৫ সালে ১.০৪ টাকা, ২০১৭ সালে ১.২৮ টাকা, ২০১৮ সালে ১.৫১ টাকা, ২০১৯ সালে ১.৬১ টাকা, ২০২০সালে .৫১ পয়সা। বিগত ৭ বছরে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার প্রতি আয় যেখানে ২ টাকার উপরে উঠতে পারেনি, সেখানে চলতি বছর অলৌকিক শক্তির বলে কোম্পানিটি ৭.৫৩ টাকা EPS দেখিয়েছে। ১২ টাকার শেয়ারটি যখন দাম বাড়তে বাড়তে ১৮০ টাকা চলে গেল অর্থাৎ ১৮০০% দাম বেড়ে গেল তখন কিনা কোম্পানিটি এই বিশাল পরিমাণ আয় দেখালো। অবাক লাগে যখন দেখি কোম্পানিটি গত বছর প্রথম প্রান্তিক EPS ছিল মাত্র ০.১৪ পয়সা আর চলতি বছর প্রথম প্রান্তিক EPS দেখিয়েছে ৪.১১ পয়সা। দেখে মনে হচ্ছে কোম্পানিটি EPS এর কারখানা দিয়েছে। বাজারে বেক্সিমকো লিমিটেডে নিয়ে কিছু বিনিয়োগকারী ভাইদের ভুল ধারনা আছে। যেমন ১) বেক্সিমকো ফার্মার আয় বেড়েছে তাই বেক্সিমকো লিমিটেডের আয় বেড়েছে। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন বেক্সিমকো ফার্মার মাত্র ২৯ লক্ষ শেয়ার বেক্সিমকো লিমিটেডের হাতে রয়েছে। ২) বাজারে অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেন আকাশ ডি টি এইচ বেক্সিমকো লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বেক্সিমকো লিমিটেডের সাথে আকাশ ডি টি এইচ এর কোন সম্পর্ক নেই। আকাশ ডি টি এইচ বেক্সিমকো কমিউনিকেশনের একটি পণ্য। আর বেক্সিমকো লিমিটেডের সাথে বেক্সিমকো কমিউনিকেশনের কোন সম্পর্ক নেই।
❍ ওরিয়ন ফার্মাঃ ২০১৩ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে শেয়ারটি কখনই তার ইস্যু মূল্যের উপরে উঠতে পারেনি। ২০১৪ সালের পর থেকে শেয়ারটি বেশির ভাগ সময় ৪০ টাকার নিচেই অবস্থান করেছে। ওরিয়ন ফার্মা যে টাকা আয় করতো তার ৬০% আসতো তার ২টি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে। দুঃখ জনক হলেও সত্য গত মে এবং জুন মাসে পাওয়ার প্ল্যান্ট ২টি বন্ধ হয়ে গেছে। মজার বিষয় হচ্ছে তারপর থেকেই শেয়ারটির দাম ৪৫ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে এখন ১০০ টাকা। কোম্পানিটির প্রথম প্রান্তিক EPS এসেছে মাত্র ৩০ পয়সা যেখানে গত বছর ছিল ৮২ পয়সা। কারন হিসেবে কোম্পানি পাওয়া প্ল্যান্ট বন্ধ হওয়ার কথা বলেছে। ওরিয়ন ফার্মার মূল ব্যবসা অর্থাৎ ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসার অবস্থাও খুব একটা ভালো না। দেশের প্রথম ২০টি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির মধ্যে ওরিয়ন ফার্মা নেই। কিন্তু তারপরও এই কোম্পানি দাম বেড়েই চলছে। ওরিয়ন ফার্মার এই দাম বৃদ্ধি দেখে আমার ২০১৮ সালের KPCL এর কথা মনে পড়ছে। ২০১৮ সালের শেষের দিকে যখন KPCL এর পাওয়ার প্ল্যান্ট গুলো বন্ধ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল ঠিক তখনি ৫০ টাকার KPCL ১৪০ টাকা তুলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল।
❍ ফরচুন সুজঃ ১৫ টাকার শেয়ার ৫ মাসের ব্যবধানে ১০০ টাকা। মালিকের হাতে মাত্র ৩০% শেয়ার থাকা কোম্পানিটি নিয়ে বাজারে রয়েছে মুখরোচক গল্প। কোম্পানির ৪ প্রান্তিক মিলে নিরীক্ষিত EPS ছিল ১.৫৯ সেখানে প্রথম প্রান্তিকে অনিরীক্ষিত EPS দেখিয়েছে ১.২৯ যা বড় ধরনের অসঙ্গতিপূর্ণ।
❍ ডেল্টা লাইফ ইন্সুরেন্সঃ আর ১ মাস পর কোম্পানিটির ৩ বছরের ডিভিডেন্ড বকেয়া হয়ে যাবে। ২০১৯ এবং ২০২০ সালে কোম্পানিটি ডিভিডেন্ড দেয়নি। হিসেব মতে এই কোম্পানিটি ক্রয় করার জন্য লোন বন্ধ থাকার কথা। অথচ লোন নিয়ে দেদারছে এই শেয়ার ক্রয় হচ্ছে। কোম্পানিটিতে বড় ধরনের অসঙ্গতি থাকায় সরকার এই কোম্পানিতে প্রশাসক বসিয়েছে। অথচ ৫ মাসের ব্যবধানে শেয়ারটি ৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা চলে গেছে। অথচ বাজারে ভালো ভালো ডিভিডেন্ড দেয়া সকল জীবন বীমা কোম্পানির দাম ১০০ টাকা নিচে। এই দাম বৃদ্ধির পেছনে যে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে তা পরিষ্কার।
❍ আই এফ আই সি ব্যাংকঃ বাজারের ব্যাংক সেক্টরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে IFIC ব্যাংকের। অথচ বাজারে ব্যাংক সেক্টরের মধ্যে অন্যতম দুর্বল ব্যাংক হচ্ছে এই IFIC ব্যাংকটি। শুনলে অবাক হবেন IFIC ব্যাংকটি ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কখনই ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। সব সময় কাগজ ধরিয়ে দিয়েছে। গত বছরও ৫% স্টক অর্থাৎ কাগজ ধরিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসারে আশা করা যায় আগামী বছরেও কোম্পানিটি ৫% স্টক ডিভিডেন্ডের বেশি দিতে পারবেনা।
❍ জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডঃ মালিকের হাতে মাত্র ৩৫% শেয়ার থাকা কোম্পানিটি প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে। জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড এর বেশির ভাগ প্লেসমেন্ট শেয়ার মালিকপক্ষ তাদের নিজেদের মধ্যেই রেখেছেন বলে পত্রিকায় লেখালিখিও হয়েছিল। শুধু তাই নয় এই শেয়ার নিয়ে কারসাজি জন্য গত বছর বিএসইসি দুই ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার জব্দের নির্দেশও দিয়েছিল। অবাক করা বিষয় হচ্ছে এর পরও এর দাম বেড়েই চলেছে। আইপিও তে ১০ টাকায় আসা শেয়ারটি এখন ১৭০ টাকা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, প্লেসমেন্ট শেয়ার নিয়ে যে কারসাজির কথা শুনা গিয়েছিল সেই প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রয় করা ২ কোটি ৩৯ লক্ষ পাবলিক শেয়ার ২ মাস পর বিক্রয় যোগ্য হবে অর্থাৎ লকইন ফ্রি হচ্ছে, যা বাজারে সেল করতে কোন ধরনের নোটিস দিতে হবে না। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে জেনেক্স ইনফোসিসের এই প্লেসমেন্ট শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্যই কি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারটি ১৭০ টাকা উঠানো হলো? সময়ের সাথে সাথে সব উত্তর পরিষ্কার হয়ে যাবে। গত ১০ বছরের মধ্যে ইনডেক্স বর্তমানে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকলেও অধিকাংশ বিনিয়োগকারী লোকসানে রয়েছেন। কারন ইনডেক্স ৭০০০ এর উপরে থাকলেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৮২টি কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৫১টি কোম্পানি এবং মিউচুয়াল ফান্ডের দাম ৫০০০ ইনডেক্সে যে দামে ছিল ৭০০০ ইনডেক্সেও সেই দামেই অবস্থান করছে।
যেমনঃ
❍ ইউনাইটেড পাওয়ারঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ২৯০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ২৫৭ টাকা। ১৭০% ডিভিডেন্ড দেওয়ার পরও শেয়ারটির দাম বাড়তে পারেনি উল্টো কমে গেছে।
❍ কনফিডেন্স সিমেন্টঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ১২০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ১১৭ টাকা।
❍ অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ২০০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ১৫৭ টাকা।
❍ মবিল যমুনাঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ৯০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ৮৭ টাকা।
❍ সিঙ্গার বাংলাদেশঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ১৮৫ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ১৫৭ টাকা।
❍ মীর আক্তারঃ ৫৩০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ৯০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম ৬৪ টাকা। আইপিওতে শেয়ারটির কাট-অফ প্রাইজ ছিল ৬০ টাকা।
❍ বিবিএস ক্যাবলঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ৬০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ৫৭ টাকা।
❍ সামিট পাওয়ারঃ ৫০০০ ইনডেক্সে এর দাম ছিল ৫০ টাকা, ৭০০০ ইনডেক্সে এই শেয়ারের দাম এখন ৩৮ টাকা। উপরের কোম্পানি গুলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ডিভিডেন্ড এবং সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানি গুলোর মধ্যে অন্যতম। এভাবে নাম বললে আরও অনেক কোম্পানির নাম চলে আসবে। বাজারে লক্ষ করলে দেখা যায় যে শেয়ার গুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ধরিয়ে দিতে পারলে মালিক পক্ষ বেঁচে যায় সেই কোম্পানি গুলোর দাম বাড়ছে এবং বাজারের লেনদেন গুলো সেই কোম্পানি গুলোর দখলে। এভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে যে শেয়ার গুলোর মূল্য বৃদ্ধি করা হয় যেগুলোর মূল্য হয়তো সাময়িক বৃদ্ধি পায় কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা কখনই ধরে রাখতে পারেনা। যা একটি সময় পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা সৃষ্টি করে ফেলে। যা গত ১০ বছর থেকেই বিনিয়োগকারীরা দেখে আসছে। একটি কথা মনে রাখতে হবে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানি গুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট না করতে পারলে বাজার কখনও ভালো হবেনা।
লেখক: মাসুদ হাসান
ডেইলি শেয়ারবাজারডটকম/নি.






















Recent Comments