নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিনিয়োগের দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ইন্স্যুরেন্স খাতের কোম্পানিটি সহযোগি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে অর্ধকোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে। বিনিয়োগকারীদের এই অর্থ বিনিয়োগ করে লোকসান করায় হতাশা ও ক্ষোভ ঝেড়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু যে সহযোগি প্রতিষ্ঠানেই লোকসান করেছে তাই নয়, খেলাপি ও দেউলিয়াগ্রস্ত একাধিক ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা ফিক্সড ডিপোজিট রসিদ(এফডিআর) করেছে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স। আর এসব ব্যাংক থেকে এফডিআরকৃত সেসব অর্থ উত্তোলনে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিটি। আদৌ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিটি এই অর্থ ফেরত পাবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে এ নিয়েও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
(ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে পরবর্তী পর্ব।)
জানা গেছে, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের সহযোগি কোম্পানি ভেনচুরা অ্যাসেটস ম্যানেজমেন্ট। বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) সহযোগি প্রতিষ্ঠানটিতে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স লোকসান করেছে ৭০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭০ টাকা লোকসান।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ, দেউলিয়া ও ঋণ খেলাপিতে জর্জরিত সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামি ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে ৮ কোটি ৭২ লাখ টাকার এফডিআর করেছে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স। মাত্রাতিরিক্ত ঋণ খেলাপি হওয়ায় ইতিমধ্যে এই পাঁচটি ব্যাংককে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার একীভূত করে, যার নাম দেওয়া হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ফলে ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের এই অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে ইতিমধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এই অর্থ উত্তোলনের জন্য চেষ্টা করেছে। কিন্তু আশানুরুপ কোন ফল এখন পর্যন্ত পায়নি কোম্পানিটি।

এদিকে, দিনকে দিন ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সের প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আগ্রহ কমতে শুরু করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ডিপোজিট প্রিমিয়ামে। সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানির ডিপোজিট প্রিমিয়াম কমেছে ৪ কোটি ১১ লাখ ৭২ হাজার ৭৩৭ টাকা।

জানা গেছে, বিদায়ী বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিপোজিট প্রিমিয়াম এসেছে পাঁচ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ৪৯১ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৯ কোটি ৬৪ লাখ ৪৩ হাজার ২২৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ডিপোজিট প্রিমিয়াম কমেছে ৪৩ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অসততা ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে ক্রিস্টাল ইন্সুরেন্সের ম্যানেজমেন্ট। বিদায়ী বছরে কোম্পানির পুঁজিবাজারে রিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে এক কোটি দুই লাখ ৯৫ হাজার ৩০৩ টাকা।

এসব ব্যাপারে জানতে কোম্পানি সচিব মাহফুজুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি এসিসটেন্ট কোম্পানি সচিব ফয়েজ আহমেদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নসমূহ হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন। কিন্তু প্রশ্নসমূহ পাঠানো হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। এর আগে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শহিদুল্লাহকে ফোন করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স বিনিয়োগকারীদের কথা ভাবলে এভাবে আমাদের অর্থ যেখানে-সেখানে বিনিয়োগ করে তছরুপ করতে পারতো না। এমনও হতে পারে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য উল্লেখিত জায়গাগুলোতে বিনিয়োগ করেছে। বিনিময়ে তারা লাভাবান হয়েছে কিন্তু কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব আসলে দেখার কেউ নেই। যে-যেভাবে পারছে কোম্পানিকে লুটেপুটে খাচ্ছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের শেষের দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের পরিশোধিত মূলধন ৪৪ কোটি টাকা, যেখানে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৫৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২১ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে দশমিক ০১ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আজ সমাপনী শেয়ার দর ছিল ৭৯ দশমিক ৪০ টাকা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
























Recent Comments