শনিবার, ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeঅর্থনীতিচীনের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত
spot_img
spot_img

চীনের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত

ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: ২০২৬ সালের মাত্র দুই সপ্তাহ পার হতেই চীনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সাল জুড়ে চলা শুল্ক যুদ্ধের চাপ সত্ত্বেও দেশটির রপ্তানি কমার বদলে উল্টো বেড়েছে। গত বছর চীনের বার্ষিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে—যা বিশ্ব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

এই তথ্য প্রকাশের ঠিক পরদিনই গণমাধ্যমে এক নিবন্ধে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ঈশ্বর প্রসাদ। তিনি লিখেছেন, মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের চেয়েও বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত।

অধ্যাপক প্রসাদ যুক্তি দেখিয়েছেন যে, চীনের সস্তা পণ্য শুধু উন্নত দেশগুলোর উৎপাদন খাতেরই ক্ষতি করছে না, বরং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্যও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে। তিনি লিখেছেন, ‘‘বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়েও নিজের প্রবৃদ্ধির জন্য অন্য দেশগুলোর ওপর এভাবে নির্ভরশীল হওয়া আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতিভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে।’’

এদিকে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের সাবেক প্রধান সম্পাদক হু সিজিন ১৬ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইবোতে এক পোস্টে ভিন্ন সুর চড়িয়েছেন। তিনি লিখেছেন, চীনের এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ‘ওয়াশিংটনের অভিজাত শ্রেণিকে আতঙ্কিত করে তুলেছে’। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, ‘‘চীনের অর্থনীতি অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক; কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ দিয়েই একে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’’

হু সিজিন আরও উল্লেখ করেন যে, চীনের এই পণ্য রপ্তানি কোনো যুদ্ধজাহাজের জোরে হচ্ছে না, কিংবা কাউকে কেনাবেচায় বাধ্যও করা হচ্ছে না। তার ভাষ্যমতে, চীন স্রেফ সততা ও পরিশ্রমের সঙ্গে পুরো বিশ্বের সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

চীনের এই রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্তের—অর্থাৎ রপ্তানি ও আমদানির মধ্যকার ব্যবধানের—প্রভাব পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে হলে এর নেপথ্য কারণগুলো আগে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশাল অংকের এই উদ্বৃত্তের কারণগুলো বেশ স্পষ্ট: একদিকে শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ, অন্যদিকে আমদানির দুর্বল গতি।

গত বছর চীন-মার্কিন শুল্ক যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমলেও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) রপ্তানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে রেকর্ড ২৫.৮ শতাংশ। স্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতির কারণে পণ্যের জোরালো চাহিদার পাশাপাশি চীনের উৎপাদন খাতে টানা মুদ্রাসঙ্কোচন এবং ইউয়ানের মান কমে যাওয়ায় চীনা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য অংশীদারদের পাল্টা ব্যবস্থার ঝুঁকি
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সাল জুড়ে চীনের মোট আমদানির পরিমাণ বেড়েছে মাত্র ০.৫ শতাংশ— যা রপ্তানির ৬.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক কম। ফলে বাণিজ্য উদ্বৃত্তের ব্যবধান আরও প্রকট হয়েছে। আমদানির এই মন্থর গতির পেছনে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার ধারাবাহিক অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে চীনে ভোক্তা পণ্যের খুচরা বিক্রির প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে নভেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ১.৩ শতাংশে নেমে আসে। অন্যদিকে আবাসন খাতের সংকটে পড়ে দেশটির স্থির সম্পদে বিনিয়োগের পরিমাণও সংকুচিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ১৯৯৮ সালে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম বার্ষিক বিনিয়োগে পতন দেখা দেবে। মূলত অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগে এমন স্থবিরতার কারণে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

২০২৫ সালের সাতটি মাসেই চীনের মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল; অথচ ২০২৪ সালে এমনটি ঘটেছিল মাত্র একবার। এটি প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী রপ্তানি ও কম আমদানির এই ভারসাম্যহীনতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এই রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চীনের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একইসঙ্গে সুসংবাদ আবার উদ্বেগজনক সংকেতও।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিশাল অংকের এই উদ্বৃত্ত চীনের উৎপাদন খাতের শক্তিশালী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ। শক্তিশালী রপ্তানি প্রবাহ চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। তদুপরি, ঘনীভূত হতে থাকা জ্বালানি সংকট এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের এই সময়ে চীন সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত মানের পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। এটি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপ কমাতে সাহায্য করছে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। উচ্চ বাণিজ্য উদ্বৃত্ত মূলত রপ্তানির ওপর চীনের অতি-নির্ভরশীলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হবে। ফলে চীন এমন এক দুষ্টচক্রে আটকে যেতে পারে, যেখানে বৈশ্বিক চাহিদা শক্তিশালী থাকলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা থাকবে অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি বাণিজ্যিক অংশীদারদের ক্ষুব্ধ করতে পারে এবং চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বাধার পাল্লা আরও ভারী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।

ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে শুল্ক যুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের বিরতি চললেও, এই চোখ কপালে তোলা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আবারও চীনের বিরুদ্ধে ‘শুল্ক অস্ত্র’ ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিকে নিয়ে অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যেও সতর্কতা বাড়ছে।

গত বছরের প্রথম ১১ মাসেই চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এক সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, চীন যদি রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধি মডেলের ওপরই অনড় থাকে, তবে তা বিশ্ব বাণিজ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে। একইভাবে গত মাসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গণমাধ্যমকে বলেন, বেইজিং যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের এই বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা নিরসনে ব্যর্থ হয়, তবে ইইউ চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে পারে।

অবশ্য চলতি মাসের শুরুর দিকে গুয়াংডং প্রদেশে এক পরিদর্শন সফরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে, চীনের উচিত সক্রিয়ভাবে আমদানির পরিধি বাড়ানো এবং আমদানি-রপ্তানির মধ্যে আরও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে এই সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও-এর বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি জানান, চলতি বছর সমন্বিত বাণিজ্য মেলা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ক্রয়ের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে আমদানি বাড়িয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করবে চীন।

আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এসব বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, বেইজিং হাত গুটিয়ে বসে থেকে বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে দেবে না। ২০২৬ সালে পা রেখেই চীন বাণিজ্যিক উত্তেজনা প্রশমনে তৎপরতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং সোলার সেল—এই ‘নতুন তিনটি’ পণ্য নিয়ে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে বিশেষ জোর দিচ্ছে দেশটি।

চলতি মাসের শুরুর দিকে চীন সরকার ঘোষণা করেছে যে, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে তারা ফটোভোলটাইক পণ্যের ওপর রপ্তানি ভ্যাট রিবেট বা কর ফেরত সুবিধা বাতিল করবে। পাশাপাশি ব্যাটারি পণ্যের ক্ষেত্রে এই সুবিধার হার কমিয়ে আনা হবে এবং আগামী বছর থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া, চলতি সপ্তাহে চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। এর ফলে চীনা গাড়ি নির্মাতারা এখন অ্যান্টি-সাবসিডি শুল্কের বদলে ন্যূনতম মূল্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ পাবে।

শেষ পর্যন্ত এই বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চীন ও বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি অভিশাপ, তা নির্ভর করছে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। রপ্তানি থেকে অর্জিত আয় দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে ফিরছে কি না, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আমদানির গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারছে কি না এবং এর মাধ্যমে বাজার আরও উন্মুক্ত হচ্ছে কি না—তার ওপরই সব নির্ভর করছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি হু সিজিনের করা ভবিষ্যদ্বাণীর মতো অতটা আশাব্যঞ্জক নয়, আবার অধ্যাপক প্রসাদ যেমনটি আশঙ্কা করছেন, সম্ভবত এটি ততটা উদ্বেগজনকও নয়।

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments