ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: শুধু জরিমানা বা মামলা নয়, চালকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ভিত্তিক নজরদারি, পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপ এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
সম্প্রতি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান এসব উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
পরিবহন শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্টেশনে হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। এসব ক্যাম্পে চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নতুন এই উদ্যোগ সম্পর্কে আনিছুর রহমান বলেন, একজন বাসচালক একসঙ্গে ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষের জীবন নিয়ে চলাচল করেন। তাই চালকের শারীরিক সুস্থতাও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও সময়ের অভাবে অনেক চালক চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। চিকিৎসার জন্য কয়েক দিনের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে চিকিৎসা নেন না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চালকদের কাছেই স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ট্রাফিক সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, সম্প্রতি নিজে শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করিয়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হিয়ারিং লসের বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তার মতে, প্রত্যেক নাগরিকের অন্তত একবার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে শব্দদূষণের কারণে শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আনিছুর রহমান বলেন, ১০০ জন চালকের শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা হলে তাদের বড় একটি অংশের শ্রবণক্ষমতায় সমস্যা পাওয়া যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ গবেষণাও করছে। দীর্ঘ সময় ধুলাবালি, ধোঁয়া ও উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে দায়িত্ব পালনের কারণে ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে ফুসফুসের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী কোমরব্যথা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যা বেশি দেখা যায় বলেও জানান তিনি।
বেপরোয়া গতি, উল্টো পথে চলাচল ও ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে যানবাহনে জিপিএস প্রযুক্তি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আনিছুর রহমান।
তিনি বলেন, জিপিএস চালু হলে একটি যানবাহন কখন সড়কের কোন অংশ অতিক্রম করেছে এবং সেটি নির্ধারিত পথে চলেছে নাকি উল্টো পথে এসেছে, তা জানা সম্ভব হবে। এতে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সমন্বিত বা ‘হলিস্টিক’ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু চালকের কারণে ঘটে না। চালকের পটভূমি, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, সড়কের নকশা, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, যানবাহনের ফিটনেস এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণ, সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে। তাই এ সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকৃত মহাসড়কে পাশের ফিডার সড়ক থেকে সরাসরি যানবাহন ওঠার সুযোগ থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এলজিইডির সড়ক সরাসরি মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত ব্যারিয়ার বা ধীরে মূল সড়কে ওঠার ব্যবস্থা নেই। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
ট্রাফিক আইন প্রয়োগ সম্পর্কে আনিছুর রহমান বলেন, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তির বিধান রয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে ২০২৫ সালের বিধিমালার আওতায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী কালো ধোঁয়ার পাশাপাশি শব্দদূষণ রোধেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও জরিমানা দেওয়ার পর অনেক গাড়ি আবারও সড়কে নেমে পড়ে বলে জানান তিনি। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আনিছুর রহমান বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের মূল বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন অনুযায়ী ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস এবং ২৫ বছরের বেশি পুরোনো ট্রাক সড়কে চলাচল করতে পারে না।
এ জন্য একটি স্ক্র্যাপ নীতিমালা করা হয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দেওয়া হয়েছে। পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন স্ক্র্যাপ করা গেলে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম

































Recent Comments