মঙ্গলবার, ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeবিনোদনটিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে: ডলি জহুর
spot_img
spot_img

টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে: ডলি জহুর

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: ব্যস্ত নাগরিক জীবনের মাঝে কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা হৃদয়ে গেঁথে যায় গভীরভাবে। তেমনি এক বিকেল কেটেছে গত বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশের একুশে পদকপ্রাপ্ত নন্দিত অভিনেত্রী ডলি জহুর-এর ঘরোয়া আতিথেয়তায়। শিল্পী নিজেই দরজা খুলে অভ্যর্থনা জানালেন, হাসিমুখে। ছাইরঙা পাড়ের প্রিন্টেড শাড়ি পরা হালকা সাজে তাঁকে দেখে মনে হলো, এই মানুষটি শুধুই একজন অভিনেত্রী নন, তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী, যিনি নিজের জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাকে শিল্পে পরিণত করেছেন।

বিকেলে পৌঁছাই তাঁর উত্তরার বাসায়। বাড়ির পরিবেশ যেমন প্রশান্ত, তেমনি শিল্প-সংস্কৃতির ছোঁয়ায় ভরপুর। প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে পুরোনো দিনের নিজের ছবি, কোনোটা ছোট আবার কোনোটা বড়। পুরস্কার, আর স্মৃতিরা সাজানো আলোকিত শোকেসে। পুরো ঘরটি নান্দনিকভাবে সাজানো।

নিজের হাতে চা বানিয়ে দিলেন, সঙ্গে নানা পদের মিষ্টি, হালুয়া, ছোলাবুটসহ হরেক রকম খাবার। আড্ডার মাঝে বারবার বললেন, ‘তোমরা এলে খুব ভালো লাগল। এখন তো খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। শিল্পীরা তো একাকীত্বেও সঙ্গী খোঁজে।’

প্রথমেই উঠে এলো বাংলাদেশের নাটকের সুবর্ণ যুগের প্রসঙ্গ। আশি ও নব্বইয়ের দশকে ছোটপর্দার যে বিপ্লব ঘটেছিল, সেই সময়ের অনেক গল্পই ডলি জহুরের স্মৃতিতে এখনও টাটকা। আলাপের শুরুতেই তিনি অকপটে বললেন, ‘আমাদের সময়ের নাটকের বিষয়বস্তু মানুষকে ভাবতে শেখাতো। এখন ভালো কাজ হচ্ছে, তবে টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেক প্রতিভা হারিয়ে যাচ্ছে।’

আধুনিক মিডিয়া, নাটকের পরিবর্তন, সিনেমার নতুন ভাষা এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ছিল গভীর ও চিন্তাশীল। তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন কিছু উদীয়মান নির্মাতার কাজের এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেন কিছু কনটেন্টের মান নিয়ে।

ডলি জহুরের সঙ্গে আড্ডা মানেই শুধু স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের ভাবনাও। শুধু সাক্ষাৎ নয়, যেন সময়কে ছুঁয়ে ফেরা এক যাত্রা ছিল সেই বিকেল। একজন শিল্পীর জীবনের পর্দার পেছনের গল্প, মিডিয়ার বিবর্তন আর শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতার স্পষ্ট চিত্র উঠে এলো তাঁর সহজ-সরল অথচ গভীর কথায়। এতবড় মাপের একজন শিল্পী, অথচ কত সহজ, কত আন্তরিক।

ব্যক্তিগত কথাও উঠে এলো আলাপে আলাপে। স্মৃতির জালে ভেসে এলো প্রয়াত নায়করাজ রাজ্জাক, আসলাম তালুকদার মান্না ও সালমান শাহর কথা।

আড্ডায় আক্ষেপের কিছু সুরও উঠে আসে তাঁর মুখে। অনেক সিনেমাতে কাজ করলেও তাঁকে ঠিকমতো দেওয়া হয়নি পারিশ্রমিক! আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা যারা মা-খালা চরিত্রে অভিনয় করি, কোনো মর্যাদা ইন্ডাস্ট্রিতে পাইনি– এটি সত্যি কথা। আমার সারাজীবন শুনতে হয়েছে, ‘আপনি টাকার জন্য কাজ করেন নাকি?’
টাকার জন্য নাকি কাজ করি না, অথচ আমি যে কষ্ট করেছি সিনেমাতে। আমরা তো নায়ক-নায়িকার মতো বেশি টাকা পাই না। মায়ের অভিনয় করতাম, টাকা কম পেতাম। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে চলে আসি ২০১১ সালে, এরপর আর কাজ করিনি। তখনও আমি পারিশ্রমিকের ৩৪ লাখ টাকা পাইনি।

নিজের দুঃসময়েও নিজের কাজের টাকা পাননি ডলি জহুর। অনেক করে বলার পরও কোনো সুরাহা হয়নি; বরং যোগাযোগই বন্ধ করে দেন তাঁর সঙ্গে। এই অভিনেত্রীর স্বামী তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত, সেই সময় যেন আকাশ মাথায় ভেঙে পড়ে তাঁর। তাই স্বামীর উন্নত চিকিৎসার জন্য টাকার বিকল্প ছিল না।

ডলি জহুর বলেন, ‘‘সেই সময় আমি অনেক সিনেমা করি, অনেকের কাছে টাকা পাইতাম। এমনও হয়েছে সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, তারপরও পুরো টাকাই পেতাম না। ওই সময় আমি কেঁদে কেঁদে বলছি– ‘কিছু টাকা আমার তুলে দেন আমার স্বামীকে নিয়ে ব্যাংককে যাব।’

আমার পাওনা টাকা, যাকে দায়িত্ব দিলাম, তার কাছেও টাকা পেতাম। এরপর তো আর ওই লোক যোগাযোগ করেনি। নিজেও কোনো টাকা দেয় নাই। এমন সময়ে এক পাইও ইন্ডাস্ট্রি থেকে পাইনি।’’ এই টাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন ডলি জহুর। তাই যাদের কাছে টাকা পান সরাসরি তাদের নাম প্রকাশ করে ছোট করেননি তিনি।

এদিকে ক’দিন আগেই জীবনের ৭০তম বসন্তে পা রাখা অভিনয় জীবন নিয়ে তৃপ্তির কথাও শুনিয়েছেন, তাঁর ভাষ্যে, ‘সারাজীবন অভিনয়ই করে গেছি। যখন যে কাজটি করেছি মন দিয়েই করার চেষ্টা করেছি। কোন কাজ করে কী সম্মানী পাব সেটি নিয়ে কখনও ভাবিনি। শুধু ভাবনায় ছিল আমাকে যে চরিত্রটি দেওয়া হয়েছে তাতে যেন ঠিকঠাক মতো অভিনয়টা করে যেতে পারি। এদেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি আমি শুধু অভিনয় করেই। অভিনয় ছাড়াতো জীবনে আর কিছু পারি না, তাই এখনও অভিনয় করতেই ভালো লাগে।’

ডলি জহুরের আতিথেয়তায় ছিল আন্তরিকতা ও হৃদয়ের ছোঁয়া। তাঁর মতো গুণীজনের সঙ্গে একটি সন্ধ্যা কাটানো মানে শুধু একজন শিল্পীকে জানা নয়; বরং তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্তমানকে নতুন করে দেখার সুযোগ পাওয়া। শিল্পীর বাসা যেমন শিল্পের আবাস, তেমনি তাঁর কথাগুলো ছিল সময়কে ছুঁয়ে যাওয়া। সুন্দর কিছু অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে যখন বাসায় ফিরি তখন ঘড়ির কাঁটা ৭টা ছুঁইছুঁই।

 

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments