
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) যেহেতু পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাই পুঁজিবাজারের সকল দায়ভার বিএসইসিকেই নিতে হবে। পুঁজিবাজার ভালো হলে যেমন তারা প্রশংসিত হবেন ঠিক তেমনি পুঁজিবাজার খারাপ হয়ে গেলে তারা নিন্দনীয় হবেন।
গত কয়েকদিন থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসির মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে। ইস্যু হচ্ছে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট থেকে বন্ডকে বাদ দেয়া এবং এক্সপোজার গণনার ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজার মূল্যকে মূল্যায়ন না করে ক্রয় মূল্যকে বিবেচনায় আনা। কোন সন্দেহ নেই যে বর্তমান আইনটি পুঁজিবাজার পরিপন্থী এবং পুঁজিবাজার বিকাশের ক্ষেত্রে বড় বাধা। এই আইন গুলো নিয়ে বিগত ৫-৬ বছর থেকেই বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়ে আসছিল।
গত এক মাস থেকে পুঁজিবাজার নিম্নমুখী। দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বর্তমানে বিএসইসি বেশ উদ্যোগী হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার সমস্যা গুলো সমাধানের জন্য। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। অনেকেই ভাবতে পারেন বর্তমানে পুঁজিবাজারের যে অস্থিরতা চলছে তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দায়ী। এই বিষয়টির সঙ্গে আমি একমত নই। কারন পুঁজিবাজার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা নুতন ইস্যু না। এই আইন কার্যকর করা হয়েছে ২০১৩ সালে। এই আইন বহাল থাকা অবস্থাতেই পুঁজিবাজার ৩৯০০ ইনডেক্স থেকে ৭৪০০ পর্যন্ত উঠেছিল। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে বর্তমানে পুঁজিবাজারের এই দৈন্যদশা কেন? এই দৈন্যদশার দায়ভার পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসিকেই নিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএসইসির কিছু সিদ্ধান্তে বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়েছে, যার কারণে বাজার নিম্নমুখী এবং লেনদেন কমে গেছে।
গত বছর পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নুতন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। অতীতের যে কোন কমিশনের চেয়ে বর্তমান কমিশন পুঁজিবাজারকে একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক বেশি আন্তরিক এবং উদ্যমী। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু সিদ্ধান্ত বাজারকে দুর্বল করে দিয়েছে। কিছু দিন আগে বিএসইসি বেক্সিমকো লিমিটেডের বিশাল অংকের একটি সুকুক বন্ডের অনুমোদন দেয়। সুকুক বন্ড নিয়ে বিনিয়োগকারিদের মধ্যে আগ্রহ কম থাকায় পরপর ৩ বার টাকা জমা দেয়ার সময় বৃদ্ধি করে বিএসইসি। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে এই সুকুক বন্ডে বিনিয়োগের জন্য কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা জারি করে। যার ফলে পুঁজিবাজারে ব্যাংক গুলোর বিনিয়োগসীমা কমে যায়। বিএসইসির উচিত ছিল সুকুক বন্ডের অনুমোদন দেয়ার আগেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার লিমিট সংক্রান্ত সমস্যা গুলোর সমাধান করা।
বাজার নিয়ে আরও কিছু সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের বাজায় বিমুখ করে দিয়েছে। জেনেক্স ইনফোসিস শেয়ারটির দাম যখন ৫৫ টাকা, তখন শেয়ার নিয়ে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখে বিএসইসি দুই ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার জব্দের নির্দেশ দেয়। অথচ কারসাজি চক্র বিএসইসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেয়ারটির দাম ১৮০ তুলে ফেলে কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বিএসইসি এখন আর কারসাজি চক্র খুজে পাচ্ছেনা। আজ সব পত্রিকায় ডেল্টা লাইফ ইন্সুরেন্স নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ৩৬৮৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অথচ তালিকাভুক্ত সকল লাইফ ইন্সুরেন্সের দাম যেখানে ১০০ টাকার নিচে সেখানে ডেল্টা লাইফের দাম ২০০ টাকার উপরে। কিছু দিন আগে হামিদ ফেব্রিক্স লোকসান করেছে বলে ঘোষণা দেয় সেই দিনেই শেয়ারটি ৭২% দাম বৃদ্ধি পায়।
ওরিয়ন ফার্মার আয় কমে অর্ধেক হয়ে গেল অথচ তারপর ২ দিনেই শেয়ারটির মূল্য ১৫% বেড়ে গেল। এভাবে একটি চক্র সিরিয়াল ট্রেড করে বাজারে এক ধরনের ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা করছে। তারা বিনিয়োগকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করছে “কোম্পানি ভালো-মন্দ কোন বিষয় নয়। লাভ করতে চাইলে হাতে যে শেয়ার আছে বিক্রি করে আমাদের পেছনে আস তবেই লাভ করতে পারবে।” এই দুষ্ট চক্রের বিরুদ্ধে বিএসইসির কার্যকর কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় বিনিয়োগকারীরা ধরে নিয়েছে এরা হয়তো বিএসইসির থেকেও শক্তিশালী। যা পরবর্তীতে প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের প্রচণ্ড হতাশ করেছে এবং বাজার বিমুখ করে দিয়েছে।
বর্তমান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা দায়িত্ব নেয়ার পর তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে আইনের মধ্যে আনার জন্য যথা সাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে যা সকল মহলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু এই নজরদারি করতে গিয়ে বিএসইসি মৃত কোম্পানি গুলোর দিকে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যেমন, এমারেল্ড অয়েল, ইউনাইটেড এয়ার। এমারেল্ড অয়েল রাইস ব্র্যান অয়েল তৈরি করতো। এই ধরনের একটি রাইস ব্র্যান অয়েল কোম্পানি দিতে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা লাগতে পারে। কিন্তু এই কোম্পানির কাছে বেসিক ব্যাংক সহ মাইডাস ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়ার পাওনা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। তাছাড়া বর্তমানে ভোজ্য তেলের বাজারে এই রাইস ব্র্যান তেলের তেমন চাহিদাও নেই। সহজ ভাষায় এই কোম্পানিটি মৃত। আর ইউনাইটেড এয়ারের নিজের বলতে আছে শুধু ঋণ। শতকোটি টাকার ঋণ ছাড়া এই কোম্পানির আর কিছুই নেই। আমাদের বুঝতে হবে মৃতকে কখনও জীবিত করা সম্ভব নয়।
দুর্বল কোম্পানি গুলোর প্রতি বিএসইসির নজরদারি বেশি থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠিত ভালো কোম্পানি নজরদারির বাইরে চলে গেছে। যেমনঃ মীর আক্তার হোসেন লিমিটেড। কোম্পানিটি বর্তমান কমিশনের হাত ধরেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। যার কাটঅফ প্রাইজ ছিল ৬০ টাকা। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতের জায়ান্ট কোম্পানি মীর আক্তার হোসেন। কোম্পানিটি বর্তমানে দেশের বড় বড় মেগা প্রজেক্টে কাজ করছে। যেমন যমুনা নদীর উপর দেশের সর্ব বৃহৎ রেল সেতু, ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন সহ মোট ৪০টির উপর প্রোজেক্ট চলমান রয়েছে। যা টাকার অংকে ৬০০০ কোটি টাকার উপর। অথচ কোম্পানিটি প্রথম প্রান্তিকে আয় দেখিয়েছে মাত্র ৬ কোটি টাকা। দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি এসিআই। কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার আছে ৬০০০ কোটি টাকা অথচ কোম্পানিটি গত বছর আয় দেখিয়েছে মাত্র ৪১ কোটি টাকা। এপেক্স ফুটওয়্যার দেশের জুতা কোম্পানিগুলোর মধ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ গত বছর কোম্পানিটি আয় দেখিয়েছে মাত্র ১১ কোটি টাকা। দেশের প্রথম ২০টি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির মধ্যে একটি একমি ল্যাবরেটরিজ। অথচ কোম্পানিটির গত ৫ বছরে কোন উন্নতি নেই।
গত ১০ বছরে বিদেশী কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে ১০ গুন। সেখানে দেশের প্রথম সারির কোম্পানি গুলোর আয় উল্টো কমে গেছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? এই বিষয় গুলোকে আরও গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে বিএসইসিকে। আমরা সবাই বাজারে ভালো কোম্পানির অভাব বলে খুব চিল্লাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বিদেশী কোম্পানিগুলো ছাড়া পুঁজিবাজারে যে কয়টি ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে সেগুলোর বেশির ভালোই অবমূল্যায়িত। আমাদের মনে রাখতে হবে ভালো কোম্পানিগুলোর চাহিদা তৈরি করতে না পারলে বাজার কখনই দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করা সম্ভব নয়। ভালো কোম্পানিগুলোর মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থার সঞ্চার হয়। দেশি এবং বিদেশী নুতন বিনিয়োগকারীদের আগমন ঘটে। বর্তমান বিএসইসির কমিশনের অর্জন অনেক কিন্তু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে না পারলে এই অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। তাই আশা করবো বিএসইসির বর্তমান কমিশন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা টুকুই করবেন।
লেখক: মাসুদ হাসান, শেয়ার বিনিয়োগকারী।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/নি.






















Recent Comments