বৃহস্পতিবার, ৯ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeবিনোদনবাবার ছবি মোবাইলে রাখেন না দিলদারের মেয়ে, কারণ...
spot_img
spot_img

বাবার ছবি মোবাইলে রাখেন না দিলদারের মেয়ে, কারণ…

ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: ২০ বছর বয়সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দিলদার হয়তো বুঝতে পারেননি—হাসিই হবে তাঁর ভাষা, মানুষের মন ছোঁয়ার সবচেয়ে সহজ পথ। সেই হাসিকে সঙ্গী করেই একসময় তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কৌতুক অভিনেতা। তাঁর অভিনয়ে ছিল নির্মল আনন্দ, আবার ছিল জীবনের তীক্ষ্ণ রসিকতা। একসময় প্রযোজকদের কাছে ‘দিলদার’ মানেই ছিল হিট ছবির নিশ্চয়তা। তাঁর জন্য লেখা হতো আলাদা গল্প, চরিত্র পেত বিশেষ মর্যাদা।

মানুষকে হাসাতে হাসাতে তিনি অর্জন করেন খ্যাতি, সম্মান এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৮১ বছর। ২০০৩ সালে মারা যান। মৃত্যুর দুই দশক পরও অনেকেই মনে করেন, বাংলা চলচ্চিত্রে কৌতুক অভিনয়ের সেই জায়গাটি আজও শূন্য। অভিনয়ের ভাষা, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা আর শরীরী ভঙ্গিতে দিলদার ছিলেন স্বকীয়। সিনেমা হলে দর্শক মুগ্ধ হয়ে দেখতেন তাঁকে। আজও টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি প্রমাণ করে—দিলদার সময়কে অতিক্রম করে আছেন।

চাকরি, সংসার আর অভিনয়ের দোটানা
১৯৪৫ সালের ১৩ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্ম নেওয়া দেলোয়ার হোসেন নাম বদলে হয়েছিলেন দিলদার হোসেন। এই নামেই তিনি ঠাঁই করে নেন দর্শকহৃদয়ে। তবে পর্দার হাস্যোজ্জ্বল মানুষটির বাস্তব জীবন খুব একটা সহজ ছিল না। দিলদারের ছোট মেয়ে জিনিয়া আফরোজ বলেন, ‘সবাই আব্বুর অভিনয়ে হেসেছে, কিন্তু আব্বু নিজে খুব একটা হাসতেন না। তাঁর জীবন এতটা হাস্যোজ্জ্বল ছিল না। অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে।’

অভিনয়ে আসার আগে দিলদার চাকরি করতেন ঢাকার পূর্বাণী হোটেলে। ১৯৭৩ সালে সেখানে ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। মাস শেষে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরি, সংসারের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া সহজ ছিল না। তবু অভিনয়ের প্রতি টান তাঁকে ছাড়েনি। চাকরির পাশাপাশি মঞ্চনাটকে কাজ করতেন তিনি।

চাঁদপুর সদর থেকে ঢাকায় এসে কমলাপুরে বসবাস শুরু করেন পরিবার নিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাঁদপুরের মেয়ে রোকেয়া বেগমকে বিয়ে করেন। পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়। চাকরি, সংসার আর মঞ্চ—এই তিনের মধ্যেই চলছিল তাঁর জীবন।

টানা ১৫ বছর পূর্বাণী হোটেলে চাকরি করেছেন দিলদার। একসময় সিনেমায় ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। চাকরি নাকি অভিনয়—এই দোটানায় পড়ে যান তিনি। নির্দিষ্ট আয়ের নিরাপত্তা ছেড়ে অনিশ্চিত অভিনয়ের পথে হাঁটা সহজ ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো দিকে না তাকিয়ে অভিনয়কেই বেছে নেন। ১৯৮৮ সাল থেকে পুরোপুরি অভিনয়ে মনোযোগী হন দিলদার। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেই পথেই ছিলেন তিনি। অভিনয়ও তাঁকে উজাড় করে ভালোবাসা দিয়েছে।

পর্দার মানুষ, ঘরের মানুষ

জিনিয়া আফরোজ বলেন, ‘পর্দায় সবাইকে হাসালেও বাস্তবে আব্বু খুব রাগী ছিলেন। মানুষ তাঁকে ভয় পেত। তবে পরিবারের সঙ্গে তিনি ছিলেন ভীষণ ফ্রেন্ডলি। আমাদের সঙ্গে অনেক মজা করতেন। আমাকে লক্ষ্মী নামে ডাকতেন।’

দিলদারের পরিবারে কেউ অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তিন ভাই–বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন দিলদার। অভিনয়ে আসার ব্যাপারে পরিবার থেকে উৎসাহ না পেলেও কোনো বাধাও দেওয়া হয়নি।

দিলদারের দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মাসুমা আক্তার বর্তমানে কানাডায় বসবাস করেন, পেশায় দন্তচিকিৎসক। ছোট মেয়ে জিনিয়া আফরোজ ঢাকায় থাকেন, তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন। কিছুদিন আগে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। স্ত্রী রোকেয়া বেগম থাকেন ডেমরার সারুলিয়ায় দিলদারের বানানো বাড়িতে।

চাঁদপুর গণি মডেল স্কুল থেকে এসএসসি এবং চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন দিলদার। এরপর আর পড়াশোনা করেননি। তবে মেধা ও হাতের লেখার প্রশংসা করতেন পরিবারের সবাই। বিলাসী জীবন ছিল না তাঁদের। হিসাব করেই চলতে হতো পরিবারকে। কমলাপুরের কবরস্থানের পাশের বাসা থেকে শুরু করে মালিবাগ, গুলশান—জীবনের পথে এসেছে সুখ-দুঃখ দুটোই।কাজের নেশা আর শেষ অধ্যায়

২০০২ সালে ওপেন হার্ট সার্জারির পর চিকিৎসকেরা ছয় মাস বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ ছাড়া থাকতে পারতেন না দিলদার। গোপনে এফডিসিতে গিয়ে টুকটাক কাজ করতেন। সেখান থেকেই একসময় স্ট্রোক—২০০৩ সালের ১৩ জুলাই, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে থেমে যায় তাঁর জীবন। পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করা এই অভিনেতা ২০০৩ সালেই ‘তুমি শুধু আমার’ সিনেমার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সেরা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে।

বাবার কোনো ছবি মুঠোফোনে রাখেন না জিনিয়া আফরোজ। বলেন, ‘তাঁর ছবি দেখলেই কান্না পায়।’ জন্মদিন পালন, ঈদের আনন্দ—সব স্মৃতির সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন দিলদার। পূর্বাণী হোটেলের ফ্লোর ইনচার্জ থেকে বাংলা চলচ্চিত্রের ‘হাসির রাজা’—এই দীর্ঘ পথচলা শুধুই এক অভিনেতার গল্প নয়, এটি সংগ্রাম, সাহস আর ভালোবাসায় ভর করে বেঁচে থাকার গল্প।

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments