ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সময় প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের নর্দার্ন সি রুট (এনএসআর) ব্যবহার করে নিয়মিত জাহাজ চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে চীনা শিপিং কোম্পানি ‘সি লেজেন্ড’। কোম্পানিটির দাবি, এই পথে এশিয়া থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে মাত্র ২০ দিন।
বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত এনএসআর রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য রুটটি উন্মুক্ত হলেও এর বড় একটি অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন।
নতুন এই রুটের মাধ্যমে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় আন্তর্জাতিক বন্দর নিংবোর সঙ্গে যুক্ত হবে যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম কনটেইনার বন্দর ফেলিক্সস্টো। প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার বা ৭ হাজার ৫০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজগুলো তিন সপ্তাহের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফল হলে পূর্ব এশিয়া ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে এটি দ্রুততম সামুদ্রিক সংযোগগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ৩৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি কনটেইনার জাহাজ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিংবো বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। জাহাজটিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কনটেইনার এবং ২০ জন ক্রু। উত্তর মহাসাগরের ভাসমান বরফ পেরিয়ে জাহাজটির যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছানোর কথা।
গ্রীষ্মকালে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ কিছুটা গলে যাওয়ার স্বল্প সময়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘সি লেজেন্ড’ আগামী দুই মাসে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে জাহাজ এই রুটে পরিচালনার পরিকল্পনা করছে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক শুল্ক জটিলতা এবং প্রচলিত নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ায় বিকল্প পথের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বড় অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছে। এতে এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সময়, দুটিই বেড়েছে।
এর বিপরীতে আর্কটিকের নর্দার্ন সি রুট ব্যবহার করা গেলে দূরত্ব ও যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
তবে এনএসআর ব্যবহারে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বছরের অধিকাংশ সময়ই রুটটি ভারী বরফে আচ্ছাদিত থাকে। গ্রীষ্মকালে সীমিত সময়ের জন্য নৌযান চলাচলের সুযোগ তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের অধীন বিশেষ আইসব্রেকার জাহাজের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপের অনেক কোম্পানি এখনো এই পথ ব্যবহার করতে সতর্ক। তবে চীনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং কোম্পানি ‘প্যানস্টার’ও চলতি মাসের শেষ দিকে এনএসআর দিয়ে পরীক্ষামূলক যাত্রা পরিচালনা করতে পারে বলে জানা গেছে।
আর্কটিক রুটে চীনের নতুন এই উদ্যোগকে শুধু বাণিজ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। এর সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতির বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে।
চীন নিজেকে ‘আর্কটিকের নিকটবর্তী দেশ’ হিসেবে দাবি করে প্রায় এক দশক আগে থেকেই অঞ্চলটিতে সক্রিয়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা শুরু করে। দেশটির বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সঙ্গেও নর্দার্ন সি রুটের ব্যবহার সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়ায় চীন আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
লজিস্টিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান জেনেটার বিশেষজ্ঞ পিটার স্যান্ড সিএনএনকে বলেন, বিষয়টি শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা ও আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও রয়েছে।
ফলে মাত্র ২০ দিনে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি করা এই নতুন নৌপথ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর আর্কটিক ভূরাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments