ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করা ১২ কোটি টাকা কাজে লাগিয়ে রপ্তানি ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করতে চায় শতভাগ রপ্তানিমুখী জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েল ফুটওয়্যার লিমিটেড। এ অর্থের বড় একটি অংশ ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করবে কোম্পানিটি। পাশাপাশি কাঁচামাল, প্যাকেজিং উপকরণ ও যন্ত্রাংশ কেনার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সুদ ব্যয় কমার পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করছে কোম্পানি।
রয়েল ফুটওয়্যার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) প্ল্যাটফর্মে ইনিশিয়াল কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টর অফার (আইকিউআইও) এর মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গত ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত ১,০২০তম কমিশন সভায় কোম্পানিটির আইকিউআইও অনুমোদন করে। এর আওতায় যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে ১২ লাখ শেয়ার ইস্যু করবে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিটি শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা।Geographic Reference
কোম্পানির অনুমোদিত অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইকিউআইও থেকে পাওয়া ১২ কোটি টাকার মধ্যে ৮ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হবে। আরও ২ কোটি টাকা কাঁচামাল ও প্যাকেজিং উপকরণ কিনতে এবং ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহে ব্যবহার করা হবে। বাকি ৩৩ লাখ টাকা আইকিউআইও-সংক্রান্ত খরচে ব্যয় হবে। অর্থাৎ সংগৃহীত অর্থের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ব্যাংক ঋণ কমাতে ব্যবহার করবে কোম্পানিটি।
রয়েল ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, পুঁজিবাজার থেকে পাওয়া অর্থ কোম্পানির আর্থিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে এবং উৎপাদন কার্যক্রমে সহায়তা করবে। ব্যাংক ঋণের একটি বড় অংশ পরিশোধ করা হলে সুদ ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে কোম্পানির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও করপোরেট গভর্ন্যান্স আরও শক্তিশালী হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে কোম্পানির প্রতি আস্থা বাড়বে।
কোম্পানির প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগের ফলে মুনাফা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে মুনাফার প্রকৃত প্রবৃদ্ধি উৎপাদন, রপ্তানি কার্যক্রম, সুদ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করবে।
পুঁজিবাজার থেকে পাওয়া অর্থ কার্যকরী মূলধনের ঘাটতি কমিয়ে উৎপাদন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে বলেও আশা করছে কোম্পানিটি। এর ফলে রাজস্ব ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ এবং নতুন ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে রয়েল ফুটওয়্যার।
সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীর তিলারগাতিতে কোম্পানিটির কারখানা পরিদর্শনে দেখা যায়, তিনটি উৎপাদন লাইনই পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য জুতা তৈরি করা হচ্ছে। এসব ব্র্যান্ডের মধ্যে রয়েছে ডেইখম্যান, ইনটারস্পোর্ট, সিসাইসা, অ্যারেনা, রেডটেপ, কাপ্পা, অ্যাডমিরাল, ফুরো স্পোর্টস শুজ, বাটা, বারটেক, জেডএক্সওয়াই, ক্যাট, আমব্রো, লিডল, ফিলা, এলপিপি ও সিসিসি।
রয়েল ফুটওয়্যারের তৈরি জুতা জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রসের কাছেও পণ্য সরবরাহ করে কোম্পানিটি।
কারখানায় বর্তমানে প্রায় ৭৫০ শ্রমিক কাজ করছেন। শীত মৌসুমে উৎপাদন বাড়লে শ্রমিকের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে যায়। তখন দুই শিফটে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নতুন কর্মীদের দক্ষ করে তুলতে কোম্পানির নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও রয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে আশুলিয়ায় ২০৬ শতাংশ জমির ওপর দ্বিতীয় একটি উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করছে রয়েল ফুটওয়্যার। নতুন ইউনিট চালু হলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে। এতে বিদ্যমান ক্রেতাদের বাড়তি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্ডার নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পুঁজিবাজারে আসার সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তাই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে ইউরোপের ক্রেতারা এখন পণ্যের মান ও দামের পাশাপাশি করপোরেট গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছতা, কমপ্লায়েন্স এবং জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
কোম্পানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কয়েকজন আন্তর্জাতিক ক্রেতা রয়েল ফুটওয়্যারকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করেছেন। তাদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের করপোরেট গভর্ন্যান্স ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
এর আগে ২০২৪ সালে একই ধরনের অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিল রয়েল ফুটওয়্যার। তবে সে সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনীতির ধীরগতি এবং প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের কথা উল্লেখ করে আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেয় কোম্পানিটি। এখন ব্যবসায়িক পরিবেশ কিছুটা উন্নত হওয়ায় নতুন করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রয়েল ফুটওয়্যার বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে জুতা রপ্তানি করছে এবং একাধিক বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করছে। পুঁজিবাজার থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ব্যাংক ঋণ কমানো, উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা, রপ্তানি বাড়ানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চায় কোম্পানিটি।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ
































Recent Comments