ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার করছে একাধিক চক্র। এর মধ্যে শিকার সহজ হওয়ায় হরিণ হলো তাদের প্রধান টার্গেট। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের তোয়াক্কা না করে চোরাশিকারিরা হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা, শিং ও হাড় বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। অনৈতিক আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অবাধে বন্যপ্রাণী হত্যার সুযোগ দিচ্ছেন তারা। আবার মাঝেমধ্যে হরিণের মাংস জব্দ করা হলেও তার একাংশ কাগজপত্রে উল্লেখ করে বাকিটা হাপিস করা হচ্ছে।

এমনই একটি ঘটনার তদন্তে নেমে বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও চোরা শিকারিদের যোগসাজশের প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে দেখা যায়, খুলনার কয়রায় জব্দ করা ১২০ কেজি হরিণের মাংসের মধ্যে ৯৫ কেজিই গায়েব করেছেন বনকর্মীরা। এ মামলায় বন বিভাগের চার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিচ্ছে পিবিআই।
তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা জেলা পিবিআইর পরিদর্শক কাজী মোস্তাক আহম্মদ বলেন, অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানা যায় জালাল উদ্দিন মোল্লা, এসাহাক গাজী, মো. আসাদুল ও জাহাঙ্গীর ফকিরদের চক্র সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও কেনাবেচা করে। তারা বনে ফাঁদ পেতে হরিণ শিকারের পর তা জবাই করে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে। এ ছাড়া খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও বেশি দামে বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দেয়। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ফকির মাংস কেনাবেচার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। খুলনার রূপসা বাজারে ‘ভাই ভাই মৎস্যভান্ডার’ নামে তাঁর মাছের দোকান আছেন। সেখানে মাছ ব্যবসার আড়ালে হরিণের মাংস বিক্রি করা হয়। এ চক্রের সদস্যরা গত ১৮ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের গহিনে ঢুকে বন্যপ্রাণী শিকারের ফাঁদ পাতে। এতে আটকে পড়া হরিণের মাংস পাচারের উদ্দেশ্যে ওই রাতেই খুলনার কয়রার জোড়শিং লঞ্চঘাট থেকে ‘মেসার্স ফারিহা-সাদিয়া’ লঞ্চে করে খুলনায় জাহাঙ্গীর ফকিরের কাছে পাঠিয়ে দেয়।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের বজবজা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুরেশ চন্দ্র মিস্ত্রি হরিণের মাংস পাচারের বিষয়ে জানতে পেরে বনকর্মী মিজানুর রহমান, মোখলেছুর রহমান ও দেলোয়ার হোসেনকে নিয়ে দ্রুত খুলনার হরিহরপুর লঞ্চঘাটে যান। সেখানে রাত সাড়ে ১০টার দিকে লঞ্চ থামিয়ে বনরক্ষীরা লঞ্চের ভেতরে থাকা একটি বড় ড্রাম ও একটি প্লাস্টিকের ক্যারেট (ঝুড়ি) বোঝাই হরিণের মাংস উদ্ধার করেন। খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারেন, জব্দ মাংসের মালিক জালাল, এসাহাক, আসাদুল ও জাহাঙ্গীর। তারা ‘মাছ আছে’ বলে জোড়শিং লঞ্চঘাটের কুলি ইউনুস আলী খোকনকে দিয়ে ড্রাম ও ক্যারেটটি লঞ্চে উঠান। তখন বন বিভাগের অভিযানকারী দলটি কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও জব্দ তালিকা না করেই আনুমানিক ১২০ কেজি হরিণের মাংস নিজস্ব নৌকায় ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। পরদিন দুপুরে বন কর্মকর্তা সুরেশ চন্দ্র মিস্ত্রি ও তাঁর দল পরস্পর যোগসাজশে ঘটনাস্থল জোড়শিং লঞ্চঘাট দেখিয়ে অর্ধেক আকারের একটি ড্রামে ২৫ কেজি হরিণের মাংস জব্দ দেখিয়ে তালিকা করেন। সেই সঙ্গে আত্মসাৎ করেন বাকি মাংস।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে আদালতে করা মামলায় ইউনুস আলী খোকনকে পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে জব্দের স্থান সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনাস্থল ভিন্ন দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে মূল আসামি জালাল, এসাহাক, আসাদুল ও জাহাঙ্গীকে বাঁচাতে তাদের নাম উল্লেখ না করেই এজাহার দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, মামলার গুরুত্ব নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে ওই এজাহার দেওয়া হয়। তা ছাড়া জব্দ মাংসের সঠিক পরিমাণ উল্লেখ না করে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার চেষ্টার সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলেছে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments