শুক্রবার, ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeআন্তজার্তিকমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে
spot_img
spot_img

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, গত শুক্রবার তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করতে চাইলেও সুযোগ পাননি। কারণ অপরাধের স্বীকারোক্তি দেওয়ার বিষয়ে গত বছর তার সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, সেটি আর যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে নিতে চায় না বলে আবেদন করেছে মার্কিন সরকার।

দক্ষিণ-পূর্ব কিউবার গুয়ানতানামো বে নৌ ঘাঁটির একটি ওয়ার কোর্ট বা যুদ্ধকালীন আদালতে হাজির হওয়ার কথা ছিল ওই হামলার মুল পরিকল্পনাকারী বলে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মো. হাম্মদের, যিনি কেএসএম নামেও পরিচিত। গুয়ানতানামোর এক সামরিক কারাগারে প্রায় দুই দশক ধরে তিনি আটক রয়েছেন। সেখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দি খালিদ শেখ মোহাম্মদ। পাশাপাশি, তিনি ওই ঘাঁটির সর্বশেষ বন্দিও।

কিন্তু ফেডারেল আপিল আদালত গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আদালতের শুক্রবারের জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। এক কারণ, খালিদ এবং তার সহযোগী অপর দুই আসামির অভিযোগ স্বীকার করা সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল তা বাতিল করার জন্য মার্কিন সরকার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। মার্কিন সরকার ওই আবেদনে বলেছে, ওই চুক্তির হলে তা সরকার এবং জনসাধারণ উভয়ের জন্যই অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।

তিন বিচারকের এক প্যানেল জানিয়েছে, এই যে বিলম্বকে কোনোভাবেই আদালতের আদেশ হিসাবে ব্যাখ্যা করা উচিৎ নয় বরং এর লক্ষ্য হলো আদালত যাতে পুরো ব্রিফিং পেতে পারে এবং দ্রুততার সঙ্গে যুক্তি-তর্ক শোনার সময় পায়। এই বিলম্বের অর্থ হলো বিষয়টা এখন আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নির্ভর করবে।

এছাড়া, কথা ছিল শুক্রবার সকালে শুনানির সময় খালিদ শেখ মোহাম্মদ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই হামলায় তার ভূমিকার কথা স্বীকার করে নেবেন যেখানে যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে সেগুলো উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এবং ওয়াশিংটনের বাইরে অবস্থিত পেন্টাগন ভবনে হামলা করা হয়েছিল।

অন্য একটা হাইজ্যাক করা বিমানের যাত্রীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে শেষপর্যন্ত ওই বিমান পেনসিলভানিয়ার মাঠে ভেঙে পড়ে। খালিদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ২,৯৭৬ জনের নাম ওই চার্জশিটে উল্লেখ করা রয়েছে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন শুরু থেকে শেষপর্যন্ত ৯/১১ অভিযানের পরিকল্পনার পুরোটাই তিনি করেছিলেন।

লক্ষ্যবস্তু করা ভবনগুলোতে বিমান গিয়ে যাতে আছড়ে পড়তে পারে, তার জন্য বাণিজ্যিক কমার্শিয়াল পাইলটদের প্রশিক্ষণের চিন্তা থেকে শুরু করে হামলার গোটা পরিকল্পনাকে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনের কাছে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত- পুরো বিষয়টার নেপথ্যে তিনিই ছিলেন।

ঘটনার ২৩ বছর পর কেন শুনানি?

গুয়ানতানামো বে ঘাঁটির সামরিক আদালতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচারপূর্ব কার্যক্রম চলছে। খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও অন্য আসামিদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে কি না- এই প্রশ্ন চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।

পাকিস্তানে ২০০৩ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর তিন বছর তাকে সিআইএ-র গোপন কারাগারে কাটাতে হয়েছে, যা ব্ল্যাক সাইটস নামে পরিচিত। সন্দেহভাজনদের পেট থেকে কথা বের করার পদ্ধতি হিসাবে পরিচিত ওয়াটারবোর্ডিং অর্থাৎ জলে ডুবে যাওয়ার মতো অনুভূতি দেওয়ার পদ্ধতির মধ্য দিয়ে ১৮৩ বার যেতে হয়েছে।

‘দ্য লিস্ট ওয়ার্স্ট প্লেস: হাউ গুয়ানতানামো বিকাম দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট নোটোরিয়াস প্রিজন’ বইয়ের লেখক কারেন গ্রিনবার্গ বলেন, নির্যাতনের কারণে আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই ধরনের মামলাগুলোর বিচার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন এই জাতীয় মামলায় উপস্থাপিত প্রমাণের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার কথায়, এসব ক্ষেত্রে এমন প্রমাণ দেওয়া স্পষ্টতই অসম্ভব যে ওই প্রমাণ নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়নি। উপরন্তু এই ব্যক্তিদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেই বিষয়টাই বিচারকে আরও জটিল করে তোলে।

পাশাপাশি, এই মামলা সামরিক কমিশনের আওতাধীন, যা ঐতিহ্যবাহী আমেরিকান ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা থেকে ভিন্ন নিয়মে কাজ করে। সব মিলিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়েছে। তারপর প্রায় দুই বছর ধরে আলাপ-আলোচনা চলে। শেষপর্যন্ত গতবছর গ্রীষ্মে দোষ স্বীকার করে নেওয়া নিয়ে একটা চুক্তি হয়। খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তার অন্য দুই সহযোগীর সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল সে বিষয়ে সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে এই চুক্তির অর্থ হলো, তাদের মৃত্যুদণ্ড হবে না।

গত সপ্তাহের বুধবার আদালতে শুনানিতে খালিদ শেখ মোহাম্মদের হয়ে যে আইনজীবীরা লড়ছেন তাদের দল নিশ্চিত করেছে যে, তিনি সমস্ত অভিযোগই স্বীকার করতে রাজি হয়েছেন। খালিদকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে সাক্ষ্য দেননি তবে তার আইনজীবীদের টিমের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে ছোটখাটো সংশোধন করেছেন এবং লিখিত নথিতে কিছু শব্দের পরিবর্তনও করেছেন।

যদি ওই চুক্তি বজায় থাকে এবং আদালত আবেদন গ্রহণ করে, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে সামরিক জুরি নিয়োগ করে প্যানেল তৈরি। তাদের সামনে তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া শেষে সাজা ঘোষণা হবে।

বুধবার আদালতে আইনজীবীরা এই মামলাকে পাবলিক ট্রায়াল হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে ভুক্তভুগীদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

আইনজীবীরা জানিয়েছিলেন, চুক্তি অনুযায়ী ওই পরিবারগুলো খালিদকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ পাবে। তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সততার সঙ্গে দিতে হবে।

প্রসিকিউটর ক্লেটন জি ট্রিভেট জুনিয়র বুধবার আদালতে বলেছিলেন, ১১ সেপ্টেম্বর যা ঘটেছিল তাতে অভিযুক্তের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রমাণ উপস্থাপনের বিষয়ে আমাদের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। এই কারণেই ওই চুক্তিতে রাজি হয়েছিলেন প্রসিকিউটররা। যুক্তিতর্ক চললেও এই কার্যক্রম শুরু হতে এবং চূড়ান্ত সাজা ঘোষণা হতে কয়েক মাস সময় লেগে যেত।

মার্কিন সরকার কেন এই চুক্তি বাতিল করতে চায়?

এই চুক্তিতে যিনি স্বাক্ষর করেছিলেন তাকে নিয়োগ করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন। তবে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তির সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী সফরে ব্যস্ত ছিলেন এবং সে বিষয়ে জানার পর তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

এর কয়েকদিন পর তিনি এক মেমোতে চুক্তি বাতিলের চেষ্টা করেন। তিনি বলেছিলেন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে এই ধরনের সিদ্ধান্তের দায়ভার আমার ওপরই বর্তাবে। তবে তার সেই পদক্ষেপ সফল হয়নি। একজন সামরিক বিচারক এবং সামরিক আপিল প্যানেল দুপক্ষই রায় দেয় যে চুক্তি বৈধ ছিল এবং লয়েড অস্টিন এই মামলায় পদক্ষেপ নিতে খুব দেরি করে ফেলেছেন। চুক্তি আটকানোর আরও একটা প্রচেষ্টা করেছে মার্কিন সরকার। গত সপ্তাহে সরকার এক ফেডারেল আপিল আদালতকে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বলেছে।

আইনি নথিতে মোহাম্মদ ও আরও দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আধুনিক ইতিহাসে আমেরিকার মাটিতে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধমূলক কাজ সংগঠিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

কী বলছে নিহতদের পরিবার?

হামলায় নিহতদের পরিবারের মধ্যে অনেকেই এই চুক্তিটিকে খুব উদার বা স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে সমালোচনা করেছে। গত গ্রীষ্মে বিবিসি-র ‘টুডে প্রোগ্রাম’-এ টেরি স্ট্রাডা বলেন, গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বন্দিরা যা চায়, তাদের সেটাই করতে দেওয়া হচ্ছে। হামলায় টেরি স্ট্রাডার স্বামী টমের মৃত্যু হয়েছিল।

‘৯/১১ ফ্যামিলিস ইউনাইটেড’ ক্যাম্পেইন গ্রুপের জাতীয় সভাপতি টেরি স্ট্রাডা। তিনি বলেন, এটা খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং অন্য দু’জনের জয়। নিহতদের পরিবারের অনেকেই এই চুক্তিকে জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী বিচারের পর দোষী সাব্যস্ত করার উপায় হিসাবে বিবেচনা করেন। সরকারের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপে তারা হতাশ।

স্টিফেন গেরহার্ডের ছোট ভাই রালফ এই হামলায় নিহত হন। স্টিফেন গেরহার্ড গুয়ানতানামো বে এসেছিলেন খালিদ শেখ মোহাম্মদের স্বীকারোক্তির সাক্ষী থাকার জন্য।

তিনি বলেছেন, বাইডেন প্রশাসনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? তিনি স্থগিতাদেশ পেয়েছেন এবং বিষয়টা পরবর্তী প্রশাসনের উপর গিয়ে পড়বে। কিন্তু আর কতদিন? নিহতদের পরিবারের কথা ভাবুন। বিষয়টাকে কেন আরও দীর্ঘ করছেন?

গেরহার্ড বিবিসিকে বলেছেন, এই চুক্তি পরিবারের কাছে জয় নয়। তবে এখন সময় এসেছে এই মামলার শেষ হওয়ার এবং এই মানুষগুলোকে শাস্তি দেওয়ার একটা উপায় খুঁজে বের করার। গুয়ানতানামো বে কারাগারে ২০০৬ সাল থেকে বন্দি রয়েছেন খালিদ শেখ মোহাম্মদ। ২৩ বছর আগে ২০০২ সালের ১১ জানুয়ার এই কারাগার চালু করা হয়। ৯/১১ হামলার পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী ও বেআইনি শত্রু যোদ্ধাদের রাখার জন্যই এই কারাগার।

সেখানে আটকদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে কখনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। এই সামরিক কারাগার, সেখানে থাকা বন্দিদের প্রতি আচরণের জন্য বারবার মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।

আটকদের মধ্যে বেশিরভাগই ব্যক্তিকেই এখন অন্য দেশে প্রত্যাবাসন বা পুনর্বাসন করা হয়েছে। বর্তমানে এই কারাগারে ১৫ জন বন্দি রয়েছেন, যা এই কারাগারের ইতিহাসে সর্বনিম্ন সংখ্যা। তাদের মধ্যে ছয়জন বাদে সবারই বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে বা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম.

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments