ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি রানার অটোমোবাইলস পিএলসি’র বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ডিস্ট্রিবিউটর (পরিবেশক) হিসেবে সম্প্রতি চাইনিজ প্রতিষ্ঠান ইয়াদিয়া গ্রুপ হোল্ডিংস লিমিটেডের ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক স্কুটার বাজারে নিয়ে আসে। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে দেড় থেকে দুই বছর আগে এই ইলেকট্রিক স্কুটার দেশের বাজারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ও চুক্তি সম্পন্ন করলেও তা স্টক এক্সচেঞ্জকে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) হিসেবে সেসময় অবহিত করেনি রানার অটোমোবাইলস।
জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানি ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলে তাকে ২ ঘন্টার মধ্যে অবশ্যই স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) হিসেবে অবহিত করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের আকারে বিষয়টি ডিএসইকে জানায়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ) বিধিমালা ২০২২ এর বিধি ৬ লঙ্ঘন করেছে রানার অটোমোবাইলস।
রানার অটোমোবাইলস সূত্রে জানা গেছে, গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৩) প্রতিষ্ঠানটি তাদের ব্যবসায় ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক স্কুটার সংযোজনের বিষয়টি উল্লেখ করে, যা মোটেও মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের মধ্যে পড়ে না বলে জানান পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এধরনের তথ্য গোপন করে বিনিয়োগকারীদের সাথে রানার অটোমোবাইলস ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। এই তথ্য গোপন করার কারণে কোম্পানিটির শেয়ার দরে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা নিযে বিনিযোগকারীরা হতাশ হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ওপরে।
এব্যাপারে রানার অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে বলতে পারি ডিএসইকে আমরা আমাদের ব্যবসায় ইলেকট্রিক বাইক ব্র্যান্ড ‘ইয়াদিয়ার’ বেশ কয়েকটি মডেলের ইলেকট্রিক স্কুটার সংযোজনের বিষয়টি জানিয়েছি। তবে কোন কোম্পানির সাথে এ সংক্রান্ত আমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছি সেটি আমার মনে নেই।
সম্প্রতি দেশের বাজারে ইয়াদিয়া ইলেকট্রিক স্কুটার উদ্বোধণ করেছে রানার অটোমোবাইলস।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.জি.এম সাত্তিক আহমেদ শাহ্ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে জানান, গত ৪ জুন ২০২৫ তারিখে ইয়াদিয়া স্কুটার ব্যবসায় সংযোজনের বিষয়টি মূল্য সংবেদনশীল আকারে রানার ডিএসইকে জানিয়েছে। কিন্তু যখন তারা এ সংক্রান্ত ব্যবসায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে, সেসব বিষয়টি তারা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে ডিএসইকে জানায়নি। অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ২ ঘন্টার মধ্যে ডিএসইকে জানানো উচিত ছিল।
তিনি বলেন, কেন রানার মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে সেসময় ডিএসইকে জানায়নি সেবিষয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানটির কাছে জবাব চেয়েছি। তারা এখনও আমাদেরকে জবাব দেয়নি। আইন লঙ্ঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সঠিক জবাব না পেলে রানারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক মো. আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ইয়াদিয়া ইলেকট্রিক স্কুটার দেশের বাজারে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত চুক্তি যখন হয়েছে তখনই মূল্য সংবেদনশীল আকারে স্টক এক্সচেঞ্জকে জানানো উচিত ছিল। সেটি যদি না করে থাকে তবে আইনের লঙ্ঘন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এব্যাপারে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিএসইসির টাস্কফোর্সের সদস্য মো. আল-আমিন ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, রানার অটোমোবাইলস যদি ব্যবসা পরিধির বিষয়ে মূল্য সংবেদনশীল আকারে ডিএসইকে না জানিয়ে থাকে তবে কমপ্ল্যায়েন্স ভায়োলেট করেছে। কোম্পানির ভিতরে কি ধরনের সিদ্ধান্ত হয় সে ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান না জানালে কমিশনের পক্ষে অনেক সময় জানার সুযোগ থাকে না। তবে সাংবাদিকরা প্রতিদেবদন তৈরি করলে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যাচাই বাছাই করে কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ পদক্ষেপ নিতে পারে। তারপরেও ডিএসই ও কমিশনের আগেই জানা উচিত ছিল রানারের এই মূল্য সংবেদনশীলশীল তথ্য গোপনের বিষয়টি।
এদিকে ২০১৯ সালে বড় ধরনের আওয়াজ দিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় রানার অটোমোবাইলস। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে বাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটির ইস্যু মূল্য ছিল ৬৮ টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ধারণা ছিল প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজারে আসার পর ব্যবসায় অনেক ভালো করবে। কিন্তু তাদের আশায় গুড়েবালি। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ২৫.৭০ টাকা। অর্থাৎ গত ৬ বছরে ব্যবধানে কোম্পানিটির ইস্যু মুল্যের চেয়ে শেয়ার দর কমেছে ৪২.৩০ টাকা বা ৬২ শতাংশ।
অনেক বিনিযোগকারী আশা নিয়ে কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা লোকসানে বিক্রিও করতে পারছে না শেয়ার। কারণ এখন বিক্রি করলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে বিনিয়োগকারীদের।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত দুই বছরে কোম্পানিটি লোকসান করেছে। ২০২৩ সালে ৮৮ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে ৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে। আর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শেয়ার প্রতি লোকসান করেছে যথাক্রমে ৭.৭৫ টাকা এবং ০.৫৪ টাকা।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ কে এম মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, রানার যখন পুঁজিবাজারে আসে আমরা ভেবেছিলাম প্রতিষ্ঠানটি অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো গতানুগতিক হবে না। রানার নিশ্চয় ভালো ব্যবসা করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তাদের ব্যবসা মোটেই ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারেনি। বরং দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আসলে আমার মনে হয় প্রতিষ্ঠানটি ঠিকই ভালো ব্যবসা করছে। কিন্তু টাকা আত্মাসাৎ করার জন্য ইপিএস লোকসান বা কম দেখাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে বিএসইসির কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে রানার অটোমোবাইলস বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি। তবে ২০২৪ সালে ১১ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছিল। কোম্পানিটির পরিশোধিত মুলধন ১১৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩২টি, যার মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৪৬. ৯৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৪.৯৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিযোগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৮.১২ শতাংশ।
রানার অটোমোবাইলসের তথ্য গোপন, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ধাবাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্বে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে তুলে ধরা হবে। আজ তুলে ধরা হলো প্রথম পর্ব।
চলবে….
ডেইলি শেয়াবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments