ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি’র ঋণ খেলাপি প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। এতে করে ব্যাংকটির আমানতকারীরা পড়েছেন ঝুঁকিতে। নতুন করে ব্যাংকটিতে আমানত রাখতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। শুধু তাই নয়, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর কবির ও পরিচালনা পর্ষদের ছত্রছায়ায় অনিয়মমাফিক লোন (ঋণ) দেওয়ার কারণে ঋণ খেলাপির পরিমাণও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০০৪ সাল থেকে টানা ২০ বছর সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন আলমগীর কবির। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। গত বছরের (২০২৪) ২৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এম এ কাশেম। চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করলেও আলমগীর কবির এত দিন ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে ছিলেন। গত মাসের (জুলাই) শেষে তিনি পরিচালক পদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের গ্রাহকদেরকে দেওয়া মোট লোন বা ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৯৯৮ কোটি ৭২ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫২ টাকা। এখান থেকে ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৮১ কোটি ৩৬ লাখ ৪৮ হাজার ১০৫ টাকা বা ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। গত বছর ঋণ খেলাপির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে ৫৩ শতাংশের বেশি।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানে লোন দেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। আর খেলাপিকারকরা এসমস্ত ঋণ গত বছরের ৫ আগস্টের আগে ও পরে বিদেশে পাচার করেছে, নিজেরাও গা ঢাকা দিয়েছে।
এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ৩০০ কোটি টাকার অধিক আনরিয়েলাইজড লোকসানের কবলে পড়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক।


এদিকে বিশেষ ফান্ডের শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে ১৭০ কোটি ২৮ লাখ ৭ হাজার ৩ টাকা। আর ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে এই ফান্ডের বাজার দর এসে দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫২ টাকা। এক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লোকসানে রয়েছে ৮৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৫১ টাকা। অর্থাৎ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে মোট ৩২৬ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯০৫ টাকা লোকসান করেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, বিশেষ ফান্ডের মধ্যে বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক বন্ডে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, যেখানে ৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা আনরিয়েলাইজড লোকসান করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে এভাবে লোকসান করায় কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শিতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে দশমিক ৩২ টাকা। এর আগের বছর ইপিএস হয়েছিল এক দশমিক ৬০ টাকা। বছরের ব্যবধানে ইপিএস কমেছে এক দশমিক ২৮ টাকা ৮০ শতাংশ। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ব্যবসায়িকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া ব্যাংকটি ২০২৪ সালে গ্রাহকদের এক হাজার ৪০৪ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ৭৯৪ টাকা বেশি লোন দিয়েছে, যা কোনোভাবেই উচিত হয়নি বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নিয়ম অনুসারে সাউথইস্ট ব্যাংকে স্টেটরি রিজার্ভেও ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস অনুসারে পরিশোধিত মূলধনের সমান হতে হবে স্টেটরি রিজার্ভ। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ৩৩৭ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ৮৮০ টাকা। আর স্টেটরি রিজার্ভে রয়েছে এক হাজার ৩২৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ৮৯০ টাকা। এক্ষেত্রে স্টেটরি রিজার্ভে ঘাটতি রয়েছে ১৩ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯০ টাকা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাকে অমান্য করেছে সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি।
জানা গেছে, ঋণ খেলাপিতে জর্জরিত বে-লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে সাউথ ইস্ট ব্যাংকের মেয়াদি আমানত রয়েছে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের আলমগীর কবিরের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বে-লিজিং। সে-সময়ের পরিচালনা পর্ষদের যোগসাজসে এই অর্থ বে-লিজিংকে দেওয়া হয়েছে। এখনো বে-লিজিং থেকে সুদসহ সাউথ ইস্ট ব্যাংক এই অর্থ উঠাতে পারছে না।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রেমুনারেশন (সম্মানি) বাড়ানো হয়েছে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩২ টাকা। আর পরিচালকদের ফিস বাড়ানো হয়েছে ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২০৭ টাকা।
যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) পায়নি, আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেখানে আর্থিকভাবে বেহাল দশায় থাকা সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অন্যান্য পরিচালকদের রেমুনারেশন বা ফিস এভাবে বাড়ানো কোনোভাবেই উচিত হয়নি বলে জানান বাজার বিশ্লেষকরা।
এসব ব্যাপারে জানতে সাউথইস্ট ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মামুনুর রশিদ ডেইলি শেয়ারবাজারকে বলেন, আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। আপনি প্রধান অর্থ কর্মকর্তার (সিএফও) সাথে কথা বলেন।
পরবর্তীতে গত ২০ আগস্ট দুপুরে সিএফও মো. রাশেদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নগুলো পাঠাতে বলেন। তার কথা মতো হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর দেননি। পরবর্তীতে সন্ধ্যার সময়ে তিনি অফিসিয়ালি প্রশ্ন চেয়েছিলেন। ডেইলি শেয়ারবাজারের পক্ষ থেকে অফিসিয়ালি প্রশ্ন পাঠানো হলে তখনও তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে তিনি এই প্রতিবেদককে আজ রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। কিন্তু আজও তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, সাউথইস্ট ব্যাংক যে আর্থিক প্রতিবেদন দেখিয়েছে সেটি পুরোটাই ভুয়া। প্রতিষ্ঠানটি অল্প মুনাফা দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ফলে ঋণ খেলাপি বেড়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকের। কমিশনের উচিত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধ তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজারকে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ব্যাংকগুলোর সঠিক ঋণ খেলাপির পরিমাণ প্রকাশ হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেগুলো ধামাচাপা দিতে পারছে না। যে-কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ খেলাপির সঠিক চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখপাত্র মেজবাউল হক ডেইলি শেয়ারবাজারকে বলেন, সাউথইস্ট ব্যাংকের মতো অনেক ব্যাংক রয়েছে, যারা ঋণ খেলাপিতে আগে থেকেই ছিল। এখন সেগুলো প্রকাশ হচ্ছে। এই ঋণ খেলাপি একটা নির্দিষ্ট সময়ের।
উল্লেখ্য, সাউথইস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে আজ প্রকাশ হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

























Recent Comments