নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির সাড়ে তিন বছর যেতে না যেতেই ব্যবসায়িকভাবে ভঙ্গুর অবস্থায় পড়েছে বিডি পেইন্টস লিমিটেড। শুধু কী তাই? বিনিয়োগকারীরা যাতে আর্থিক দুরবস্থা জানতে না পারে সেজন্য ওয়েবসাইট দীর্ঘদিন ধরে অকেজো রেখে আন্ডারকন্সট্রাকশনের দোহাই দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য গোপনে ব্যস্ত বিডি পেইন্টস বিনিয়োগকারীদের অন্ধকারে রেখেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার সময় নেই প্রতিষ্ঠানটির। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজিরও অভিযোগ করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ওষুধ ও রসায়ন খাতের বিডি পেইন্টস লিমিটেডের ওয়েবসাইট দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। আর্থিক বিবরণী যাতে বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট কেউই দেখতে না পারে সেজন্য প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অনৈতিক কাজটি করে যাচ্ছে, এমন অভিযোগ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির ওয়েবসাইট আন্ডারকন্সট্রাকশন বা অকেজো হয়ে পড়ে থাকলে কর্পোরেট গভর্নেস রুলস অনুসারে তা স্টক এক্সচেঞ্জ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানাতে হয়। কিন্তু বিডি পেইন্টস ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জসহ (সিএসই) কাউকেই জানায়নি। এক্ষেত্রে রুলস সরাসরি ভায়োলেট করছে বিডি পেইন্টস।
(বিডি পেইন্টসের শেয়ার কারসাজিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে ৮ পর্বের ধারবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব)
এব্যাপারে জানতে বিডি পেইন্টসের কোম্পানি সচিব এস.এম. মামুন অর রশীদ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদককে বলেন, বিডি পেইন্টসের ওয়েবসাইট আন্ডারকন্সট্রাকশন অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া আপনার ওয়েবসাইটের কী দরকার?। কবে নাগাদ ওয়েবসাইট ঠিক হবে সেব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

তার কথার প্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদক বলেন, নিউজের জন্য আপনাদের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে তথ্য প্রয়োজন। তাছাড়া বিনিয়োগকারীরাও তো আপনাদের ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারছে না। আপনাদের কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের বিস্তারিত জানতে পারছে না। অর্থাৎ ধোয়াশার মধ্যে রয়েছেন তারা (বিনিয়োগকারীরা)। এমন কথোপকথোনের প্রেক্ষিতে মামুন অর রশীদ এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনি নিউজ করে দেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, বিডি পেইন্টের শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে যাচ্ছে একটি চক্র। আর এই চক্রকে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ইন্ধন যোগাচ্ছে। শেয়ারটি কারসাজি করে ইতিমধ্যে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ও কারসাজি চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত ছয় মাসের মধ্যে বিডি পেইন্টসের শেয়ার দর ২৮ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ৫১ টাকা ৭০ পয়সায় গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর নেমে দাঁড়ায় ৩০ টাকা ৬০ পয়সা। এক্ষেত্রে শেয়ারটির দর কমেছে ২১ টাকা ১০ পয়সা বা ৪১ শতাংশ।
এদিকে কোম্পানিটির শেয়ার দরের এমন সমীকরণে খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেছেন, শেয়ারটি নিয়ে কারসাজি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বিডি পেইন্টস। প্রতিষ্ঠানটি কারসাজির মাধ্যমে উচ্চ দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ারটি বিক্রি করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উচ্চ দামে শেয়ারটি কিনে বিপাকে পড়েছেন। তারা না পারছেন শেয়ারটি বিক্রি করতে, না পারছেন ধরে রাখতে। এদিকে যতই দিন যাচ্ছে শেয়ারটির দর কমেই যাচ্ছে। ফলে হাতে থাকা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়িকভাবে চরম বিপর্যয় অবস্থার মধ্যে রয়েছে বিডি পেইন্টস। সদ্য বিদায়ী বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে দশমিক ৩২ টাকা। অর্থাৎ মোট মুনাফা হয়েছে এক কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এর আগের বছর (৩০ জুন ২০২৪) ইপিএস হয়েছিল এক টাকা ৪৩ পয়সা। অর্থাৎ মোট মুনাফা হয়েছিল ৮ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ইপিএস কমেছে এক টাকা ১১ পয়সা বা ৭৮ শতাংশ।
এদিকে কোম্পানিটির চরমভাবে মুনাফা কমে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ঘোষিত লভ্যাংশে। ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড (নগদ লভ্যাংশ) ঘোষণা করে। আর সদ্য বিদায়ী বছরে মাত্র এক শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘোষিত ডিভিডেন্ডের পরিমাণ কমেছে ৯২ শতাংশ।
জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরের ঘোষিত ডিভিডেন্ড নিয়ম অনুসারে বিনিয়োগকারীদেরকে এখনো প্রদান করতে পারেনি। যার কারণে বিডি পেইন্টস স্টক এক্সচেঞ্জে ডিভিডেন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কমপ্ল্যায়েন্স রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি। এজন্য ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কাছে এর জবাব চেয়েছে ডিএসই।
বিডি পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল খানের কাছে এসব বিষয় জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বিডি পেইন্টস আগাগোড়া্য় নিম্নমানের কোম্পানি। কোম্পানিটির ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরের ঘোষিত ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতা নেই। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সাথে প্রতিষ্ঠানটি ছলচাতুরি করেছে। এমনকি সদ্য বিদায়ী বছরের নাম মাত্র এক শতাংশ ঘোষিত ডিভিডেন্ডও প্রদান করবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পুঁজিবাজারে এসেছেই মূলত অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসি প্রতিষ্ঠানটির এসব কুকীর্তি জানলেও তারা নির্বিকার। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সংস্থাগুলো। অনতিবিলম্বে বিডি পেইন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংস্থাগুলোর প্রতি দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, কর্পোরেট গভর্নেস রুলস অনুসারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই তাদের ওয়েবসাইট স্বচ্ছ, ত্রুটিমুক্ত রাখতে হবে এবং ওয়েবসাইটের কোনো সমস্যা থাকলে স্টক এক্সচেঞ্জকে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি যদি তাদের ওয়েবসাইট ত্রুটিপূর্ণ রাখে। পাশাপাশি স্টক এক্সচেঞ্জকে না জানায়, তবে তার ব্যাপারে আমরা বিএসইসিকে জানাই। বিএসইসি সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এটি আমাদের চলমান প্রক্রিয়া। যেসমস্ত কোম্পানি এসমস্ত কাজ করে তাদের কেউ্ ছাড় পাবে না।
তিনি আরও বলেন, যেসমস্ত কোম্পানি ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেও তা বিতরণ করেনি, সেসমস্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আমাদের টিম কাজ করছে।
উল্লেখ্য, বিডি পেইন্টসের পরিশোধিত মূলধন ৬২ কোটি টাকা, যার মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্ত/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৬৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ।























Recent Comments