সোমবার, ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার: ম্যানেজমেন্টের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, আর্থিক প্রতিবেদনে দুরভিসন্ধি দেখছেন বিনিয়োগকারীরা! (পর্ব-১)
spot_img
spot_img

ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার: ম্যানেজমেন্টের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, আর্থিক প্রতিবেদনে দুরভিসন্ধি দেখছেন বিনিয়োগকারীরা! (পর্ব-১)

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সেসরিজ লিমিটেডের ম্যানেজমেন্টের প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানির কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলিত অর্থের ব্যবহার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ২৩ মাস অর্থাৎ এক বছর ১১ মাস অতিবাহিত হলেও সেই অর্থের বিশাল একটি অংশের ব্যবহার এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি কোম্পানিটি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে তালিকাভুক্ত হয় ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার। কিউআইও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানিটি পাঁচ কোটি টাকা উত্তোলন করে। উত্তোলিত অর্থ দিয়ে কোম্পানিটি ব্যালেন্সিং, আধুনিকায়ন, বিস্তার ও প্রতিস্থাপন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং ইস্যু ব্যবস্থাপনা খরচ খাতে ব্যয় করার কথা ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, গত ২৩ মাসে মাত্র ৬১ দশমিক ৪৭ শতাংশ অর্থের ব্যবহার করতে পেরেছে কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট। অবশিষ্ট ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশের ব্যবহার এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি। এই অর্থ ব্যবহারের জন্য কোম্পানির হাতে রয়েছে আর এক মাস।

সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, সামান্য পাঁচ কোটি টাকার ব্যবহার গত ২৩ মাসেও যে কোম্পানি সম্পন্ন করতে পারেনি, সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের অর্থের ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।

তারা আরও বলেন, যে কোম্পানি ২৩ মাসে ৬১ দশমিক ৪৭ শতাংশ অর্থের ব্যবহার সম্পন্ন করতে পেরেছে। সেই কোম্পানি আগামী এক মাসের মধ্যে কিভাবে ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশের ব্যবহার সম্পন্ন করবে? এই প্রশ্ন এখন আমাদের সকলের মনে জেগেছে।

(ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সেসরিজ লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে পরবর্তী পর্ব।)

তারা এও বলেন, এমনও হতে পারে ব্যাংকে কিউআইও’র টাকা রেখে সেখান থেকে প্রাপ্য ইন্টারেস্ট বা সুদ কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করছে। ফলে কিউআইও’র অর্থের ব্যবহারে গড়িমশি করছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, শ্রমিকদের কল্যাণে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের (ডব্লিউপিপিএফ) জন্য শ্রম আইন-২০০৬ অনুযায়ী একটি ব্যাংক একাউন্ট বা হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ (মেইনটেইন) করতে হয় কোম্পানিগুলোকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যার সেই একাউন্ট বা হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ করেনি, যা নিরীক্ষক জি কিবরিয়া অ্যান্ড কো. চার্টার্ড একাউনটেন্টস কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের এমফ্যাসিস অব ম্যাটারে উল্লেখ করেছে।

এদিকে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। ইতিমধ্যে ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের কারখানা, প্রধান কার্যালয়, হিসাবসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনার জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি। কমিটি কোম্পানির ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের দেওয়া ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ’ মতামত, কিউআইও’র মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিলের সঠিক ব্যবহার, ব্যাংক লেনদেন, অব্যবহৃত অর্থ এবং সম্ভাব্য সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিষয়গুলো যাচাই করবেন। তদন্ত কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদনের দুটি হার্ড কপি এবং একটি সফট কপি কমিশনে দাখিল করতে হবে।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) কোম্পানির রেভেনিউ বা বিক্রয় রাজস্ব ও মুনাফা কমলেও কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাৎ হোসেন সেলিমের পারিশ্রমিক (রেমুনারেশন) বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা ক্ষোভ ঝেড়েছেন।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত বছর (৩০ জুন ২০২৪) সাদাৎ হোসেন সেলিমের পারিশ্রমিক বা সম্মানি ছিল ৬৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সম্মানি বেড়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, গত বছর কোম্পানির মুনাফা হয়েছিল ৫ কোটি ৪৪ লাখ ৮২ হাজার ৮৩৮ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৭৯ হাজার ৩৯০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে এক কোটি ১২ লাখ ৩ হাজার ৪৪৮ টাকা।

এছাড়াও সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানির রেভেনিউ বা বিক্রয় রাজস্ব কমলেও ইলেক্ট্রিক বা বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় বেড়েছে। গত বছর কোম্পানির বিদ্যুৎ বিল বাবদ ব্যয় হয়েছে ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৬ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৯ লাখ ৬৫ হাজার ৮৩১ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে ২১ লাখ ৪৯ হাজার ২৩৫ টাকা।

কোম্পানির এমন বেহাল দশায় বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো দেখানোকে দুরভিসন্ধি হিসেবে মতামত দিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এসব ব্যাপারে জানতে ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদাৎ হোসেন সেলিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নের উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

পরবর্তীতে কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ফেরদৌস হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নসমূহ তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে বলেন এবং ১৯ এপ্রিল দুপুরের মধ্যে উত্তর দেবেন বলে জানান। কিন্তু তিনি এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ক্রাফটসম্যানের আর্থিক প্রতিবেদনসহ সামগ্রিক বিষয় তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে। তদন্তে নন কমপ্ল্যায়েন্স কিছু পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে কমিশন।

উল্লেখ্য, ক্রাফটসম্যান ফুটওয়্যারের পরিশোধিত মূলধন ২৮ কোটি টাকা, যেখানে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৪৫.২২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে ৩২ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২.৭৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments