ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: ইয়েনের মান কমে ৪০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করে ইয়েন কেনার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দুই দেশ।
সোমবার জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে ইয়েন কেনার পদক্ষেপ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েনের অতিরিক্ত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খল ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।
অর্থমন্ত্রী সাতসুকি কাতায়ামা সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রয়োজনে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে আমরা দ্বিধা করব না।’ তবে সোমবারও বাজারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এই ঘোষণার পর ইয়েনের মান ১ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৫৫ দশমিক ২০-এ পৌঁছায়। এটি মে মাসের পর সর্বোচ্চ অবস্থান। গত মাসে ইয়েনের দর একপর্যায়ে ১৬৪-এ নেমে গিয়েছিল, যা ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইয়েনের দরপতন ঠেকাতেই নয়, জাপানি সরকারি বন্ড (জেজিবি) ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বাজারে অস্থিরতা কমাতেও তাদের দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেছে।
পূর্ব জাপানে ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ইয়েনের মান নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের সমন্বিত পদক্ষেপের পর এবারই প্রথম যৌথভাবে মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করা হলো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র ইয়েনের মান ধরে রাখতে জাপানকে সহযোগিতা করছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এশিয়ায় কৌশলগত মিত্র জাপানকে সহায়তার পাশাপাশি ইয়েনের অস্বাভাবিক দরপতন ঠেকিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির সুফল ধরে রাখাও ওয়াশিংটনের লক্ষ্য।
জাপানের শীর্ষ মুদ্রা কর্মকর্তা আতসুশি মিমুরা বলেন, ‘এই যৌথ হস্তক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের মৈত্রীরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।’ ইয়েনের দরপতন মোকাবিলায় সরকার ব্যাংক অব জাপানের মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও যৌথ হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ওয়াশিংটন ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে একই ধরনের পদক্ষেপে অংশ নিতে প্রস্তুত। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জাপানের বাজার ও মুদ্রানীতির পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে ব্যাংক অব জাপানকে সুদের হার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান।
এই অবস্থায় সবার নজর এখন ব্যাংক অব জাপানের দিকে। গত সপ্তাহে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি সেপ্টেম্বরে হার বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
মিতসুবিশি ইউএফজে মরগান স্ট্যানলি সিকিউরিটিজের প্রধান বন্ড কৌশলবিদ নাওমি মুগুরুমা বলেন, মিমুরা ও বেসেন্টের বক্তব্য সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে থাকা নীতিনির্ধারকদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর মতে, সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনাই এখন সবচেয়ে বেশি।
এরই মধ্যে দুই বছর মেয়াদি জাপানি সরকারি বন্ডের (টু-ইয়ার জেজিবি) ইল্ড ১ দশমিক ৫৪৫ শতাংশে উঠেছে, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ।
ইয়েনের অব্যাহত দরপতনে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জনপ্রিয়তাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুতে জাপানের একক হস্তক্ষেপ এবং জুনে ব্যাংক অব জাপানের সুদের হার ৩১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ শতাংশে উন্নীত করার পরও ইয়েনের দর দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হয়নি।
ব্যাংক অব জাপানের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক বাজারে ইয়েন কিনতে জাপান প্রায় ৫৮ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে।
আরও সমন্বয়ের ইঙ্গিত দিয়ে স্কট বেসেন্ট জানান, আগামী মাসগুলোতে ফেডারেল রিজার্ভের রিপারচেজ ফ্যাসিলিটির পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা।
এর আগে শনিবার জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় এক্সে দেওয়া এক বিরল বার্তায় জানায়, বাজারে তারল্যের চাহিদা মেটাতে তাদের হাতে বিভিন্ন উপায় রয়েছে, যার মধ্যে ফেডের রিপারচেজ ফ্যাসিলিটিও অন্তর্ভুক্ত।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০ সালে চালু হওয়া এই সুবিধার মাধ্যমে জাপান মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি না করেই ডলারের তারল্য সংগ্রহ করতে পারে। ফলে বাজারে হস্তক্ষেপের অর্থ জোগাড়ে টোকিওর ওপর চাপ কমে।
তবে কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারের বড় ব্যবধানের মতো কাঠামোগত কারণগুলো বহাল থাকায় কেবল বাজারে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েনের স্থায়ী শক্তিশালী হওয়া কঠিন।
এনএলআই রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সুয়োশি উয়েনো বলেন, ‘জাপানের একক পদক্ষেপের তুলনায় যৌথ হস্তক্ষেপের প্রভাব অনেক বেশি। তবে ইয়েনের দুর্বলতার মূল কারণগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। তাই এর ফলে ইয়েনের একতরফা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ
































Recent Comments