ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এরই মধ্যে গত চার কার্যদিবসে ব্যাংকটির প্রায় ৭৪ হাজার ২২১ জন গ্রাহক ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন।এসব আবেদনের বিপরীতে গ্রাহকদের দাবির পরিমাণ ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে চার কার্যদিবসে এসব আবেদন জমা পড়ে। প্রথম দিন ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক ১ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, দ্বিতীয় দিন ১৯ হাজার ৬১৩ জন ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা, তৃতীয় দিন ২১ হাজার ৮৬ জন ৯২৩ কোটি টাকা এবং চতুর্থ দিন ১৫ হাজার ৪৭৬ জন ৬৫৭ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় টাকা উত্তোলনের আবেদন অনেক কম হয়েছে। গ্রাহকদের ব্যাংকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে-এ সংখ্যাই তার প্রতিফলন। তিনি জানান, ব্যাংকটির পাঁচ পূর্বসূরি ব্যাংকের শাখাগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকা উত্তোলনের আবেদনও কমে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এর মধ্যে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) পাঁচ ব্যাংকের হিসাবে ৫ হাজার কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ব্যাংকের মালিক সরকার। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের যে আস্থা রয়েছে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আস্থা নিয়ে তারা লেনদেন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেয়াদপূর্তির আগে আমানত তুলে নিলে গ্রাহকরা শুধু মূল টাকা ফেরত পাবেন। আর নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত আমানত রেখে দিলে চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা পাওয়া যাবে। গ্রাহকরা নগদে অর্থ তুলতে পারবেন, পাশাপাশি আরটিজিএসের মাধ্যমেও অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের সুযোগ থাকছে।
সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম আজ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হয়েছে। আল-ওয়াদিয়া চলতি হিসাব, মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব, এমটিডিআর, ডিপিএসসহ বিভিন্ন হিসাবে থাকা অর্থের ক্ষেত্রে ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের মূল টাকা তুলতে পারবেন।
নগদ অর্থের ব্যবস্থা এবং শাখাগুলোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য ব্যাংকটি রোববার পর্যন্ত টাকা উত্তোলনের আবেদন গ্রহণ করেছে। এরপর আজ থেকে অর্থ পরিশোধ শুরু করা হয়েছে।
যেসব গ্রাহক তাদের হিসাব চালু রাখবেন, তারা চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা পেতে থাকবেন। ব্যাংকের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে আমানত রাখা বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে মূলধন ও মুনাফাসহ কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না।
গত ৩১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগ এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ এবং মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। তবে মূল টাকা ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা দেওয়া হবে না।
কোনো গ্রাহক আমানতের মূল টাকা তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে হস্তান্তরকারী ব্যাংকের কাছে ওই গ্রাহকের কোনো ঋণ বা আর্থিক দায় থাকলে টাকা ফেরতের আগে আমানতের অর্থ থেকে তা সমন্বয় করা হবে।
এদিকে যেসব আমানতকারী এখনই টাকা তুলতে চান না, তারা হিসাব চালু রাখলে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হারে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে মেয়াদি আমানত নির্ধারিত সময়ের আগে ভাঙলে শুধু মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে, ওই অর্থের ওপর কোনো মুনাফা পাওয়া যাবে না। অবশ্য আংশিক অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে অবশিষ্ট আমানতের ওপর প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এ নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
টাকা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের শাখাগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে আমানতকারীদের সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব গ্রাহকের তাৎক্ষণিকভাবে অর্থের প্রয়োজন নেই, তাদের প্রথম দিনেই শাখায় না এসে পরবর্তী দিনগুলোতে এসে টাকা উত্তোলনের অনুরোধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, সবাই একই সময়ে টাকা তুলতে ব্যাংক শাখায় গেলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তাই ধৈর্য ধরে পর্যায়ক্রমে টাকা উত্তোলনের জন্য আমানতকারীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
বর্তমানে ব্যাংকটির আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ। মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই খেলাপি ঋণ। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণও ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি গত বছরের নভেম্বরে কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার হিসেবে ইস্যু করার কথা রয়েছে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments