ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার আরেক দফা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর স্বল্প মেয়াদে ধার করার মাধ্যমে রেপোর সুদহার এ দফায় ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চার দফা রেপোর সুদহার বাড়ল। একই সঙ্গে আন্তঃব্যাংক ধারের সর্বোচ্চ সুদহার ১১ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সুদহার ৮ শতাংশ করা হয়েছে। মুদ্রানীতি কমিটির সুপারিশে এ সিদ্ধান্ত হয়। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট নীতি সুদহার বাড়িয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এভাবে নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ নেওয়ার সুদ আরও বাড়বে। আমানতের সুদহারও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এমন এক সময়ে সুদহার বাড়াচ্ছে, যখন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ কমিয়ে আনছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। মূলত বেশির ভাগ দেশ বেশ আগেই সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পেয়েছে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার ছিল নিয়ন্ত্রিত। সাম্প্রতিক সময়ে সুদহার ঘন ঘন বাড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বেড়ে যাওয়ায় সুদহার আর না বাড়ানোর জোর দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। ড. আহসান এইচ মনসুর গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়ার পর এক মাসে দু’বার সুদহার বাড়ানো হয়েছে। শিগগির আরও এক দফা বাড়ানো হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট ব্যাংকার ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। এটা বেশি কার্যকর হয় চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। তবে মূল্যস্ফীতি যদি দর বৃদ্ধিজনিত কারণে হয়, তখন এ নীতি খুব একটা কাজ করে না। বরং সুদহার বেড়ে অনেক সময় পণ্যমূল্য আরও বেড়ে যায়। এর আগে যখন ডলারের দর কম ছিল, তখন সুদহার বাড়ানোর দরকার ছিল। ওই সময়ে তা করা হয়নি। তিনি বলেন, সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একেবারেই যে প্রভাব নেই, তেমন নয়। সুদহার বাড়ানোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকে সার্কুলারে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ওভারনাইট রেপো নীতি সুদহার ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলো। এ ছাড়া তারল্য ব্যবস্থাপনা অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য আন্তঃব্যাংক ধারে ব্যবহৃত নীতি সুদহার করিডোরের ঊর্ধ্বসীমা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) হার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ শতাংশ করা হলো। আর নিম্নসীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ শতাংশ করা হয়েছে। এর মানে আন্তঃব্যাংক ধারে এখন থেকে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৮ শতাংশ সুদ নিতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকে কোনো ব্যাংক টাকা রাখতে চাইলে ৮ শতাংশ সুদ পাবে।
গত জুলাইতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। দুই বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। মূলত করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে একদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বেড়েছিল, আরেকদিকে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ধরে রাখার পর হঠাৎ ব্যাপক বেড়েছে। ওই সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশ সুদহার বাড়ালেও বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার পরও ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রিত সুদহার ব্যবস্থা চালু হয়।
২০২০ সালের এপ্রিল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত ছিল ৯ শতাংশ। আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি শুরুর পর গত বছরের জুলাই থেকে সুদহার নির্ধারণে প্রথমে ‘স্মার্ট’ নামে নতুন পদ্ধতি চালু হয়। যেখানে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদহার উঠেছিল ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তবে আইএমএফের শর্ত মেনে গত ৮ মে একদিনে অর্থনীতির তিন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই দিন গ্রাহক পর্যায়ে সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। নীতি সুদহার বাড়ানো এবং ডলার দরে ‘ক্রলিং পেগ’ চালু করে মধ্যবর্তী একদিনে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়। এর সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করে ডলার বেচাকেনার সুযোগ ছিল। তবে নতুন গভর্নর যোগদানের পর আড়াই শতাংশ যোগ করে তথা ১২০ টাকায় ডলার বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments