ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নানা রকম অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি ও রাইট শেয়ারের টাকা উত্তোলনের আগে কোম্পানিটি ভালো মুনাফা, শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দেখালেও পরবর্তীতে তা ধরে রাখতে পারেনি। এতে করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানিটিতে শত কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ আদৌ ফেরত পাবেন কিনা তা নিয়ে অন্ধকারে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। মালিক পক্ষের নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণেই কোম্পানিটির আজ এই অবস্থা বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীরা। এদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিএসইসি খুব দ্রুত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ও রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৬৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি। উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফা বৃদ্ধি করা। কিন্তু মুনাফাতো বৃদ্ধি হয়েইনি বরং এই অর্থ উত্তোলনের পর থেকে কোম্পানিটির ব্যবসা তলানির দিকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিটির ব্যবসা হারিকেনের আলোর মতো নিভু নিভু করছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে উত্তোলিত অর্থ যদি সত্যিই ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতো, তবে কোম্পানিটির আজ লোকসানে থাকতো না। এরকম দৈন্যদশা হতো না। এই অর্থ প্রতিষ্ঠানটি তছরুপ করেছে। কোম্পানিটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১ দশমিক ৯৫ শতাংশ শেয়ার হোল্ড করে আহমেদ রাজীব সামদানি।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যন্ত আস্থাভাজন পারিবারিক লোক ছিলেন আহমেদ রাজীব সামদানি। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি কানাডা, দুবাইসহ কয়েকটি দেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এবং ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ সেইন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। সম্পত্তি কিনেছেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনেও। পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে তিনি বিদেশে পাচার করেছেন। ২০১৭ সালে ৫০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ নিয়েছিল গোল্ডেন হারভেস্ট। যদিও শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারে ৩৪ কোটি টাকা। এই টাকার অধিকাংশও আত্মসাতের সাথে জড়িত আহমেদ রাজীব সামদানি। দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে লোকসানে থাকা কোম্পানিটি গত তিন বছরের মধ্যে দুই বছরেই লোকসান করেছে। আর এক বছর নামমাত্র মুনাফা করেছে। ২০১৩ সালে তালিকাভুক্তির সময় গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রোর শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৪ টাকা ৭২ পয়সা। এই মুনাফা দেখিয়ে সেসময় প্রিমিয়াম নিয়ে বাজার থেকে ৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে বাজার থেকে ৮৯ কোটি ৯৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২০ টাকা সংগ্রহ করে।
আরও জানা গেছে, রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে অর্জিত পুরো অর্থের ব্যবহার এখনো সম্পন্ন করতে পারেনি গোল্ডেন হার্ভেস্ট। নিয়ম অনুযায়ী, রাইট শেয়ারের মাধ্যমে যে টাকা সংগ্রহ করা হয়, সেই টাকা কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণসহ অন্যান্য কাজে পুরো অর্থ একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যদি এর ব্যত্যয় ঘটে, আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও রাইট শেয়ারের পুরো অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে রাইট শেয়ারের অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় এর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৩২ হাজার ৩৪২টি শেয়ার বাজারে ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ৮৯ কোটি ৯৩ লাখ ২৩ হাজার ৪২০ টাকা সংগ্রহ করেছিল। কোম্পানিটি বিদ্যমান চারটি শেয়ারের বিপরীতে তিনটি রাইট শেয়ার ইস্যু করেছিল।
এব্যাপারে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, গোল্ডেন হারভেস্ট অ্যাগ্রো রাইট শেয়ারের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থের মধ্যে এখনো ১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যবহার করতে পারেনি।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ১ জানুয়ারি ২০২২ সাল পর্যন্ত রাইটের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যবহারের সময়সীমা ছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে তারা এই অর্থের ব্যবহার সম্পন্ন করতে পারেনি। এরপর তারা ২১ জানুয়ারি ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই অর্থের ব্যবহার সম্পন্ন করার জন্য সময় বাড়িয়ে নেয় কমিশনের কাছ থেকে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেও এই অর্থের সম্পূর্ণ ব্যবহার সম্পন্ন করতে পারেনি। পরবর্তীতে আবারও সময় বাড়ানোর আবেদন করলে কমিশন তা বাতিল করে দেয়। তদন্তে এ সংক্রান্ত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভায়োলেন্স পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি।
গোল্ডেন হার্ভেস্টে অ্যাগ্রোর কোম্পানি সচিব মো. ইব্রাহিম হোসেইন ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমের এই প্রতিবেদককে বলেন, বিএসইসি এখনো রাইট শেয়ারের মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দেয়নি। যে-কারণে আনইউজড (অব্যবহৃত) অবস্থায় রয়েছে।
এই প্রতিবেদক তাকে বলেন, কমিশনতো অনেক আগেই এই অর্থের ব্যবহার সম্পন্ন করতে বলেছে। কিন্তু আপনারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অর্থ ব্যবহারে ব্যর্থ হয়েছেন। এরপর এই অর্থের ব্যবহার সম্পন্ন করতে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দফা সময় নিয়েছে কমিশন থেকে। তারপরেও ব্যবহার সম্পন্ন করতে পারেনি। তাহলে আপনি ভুল তথ্য দিচ্ছেন কেন?। এর প্রতিত্তরে তিনি বলেন, আমি ১২ বছর টেলিভিশনে রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। যারা টেলিভিশনের বড় বড় রিপোর্টার তারা সবাই আমাকে চেনেন। আমার সর্ম্পকে ভালোভাবে জেনে তারপর আমার সাথে কথা বলেন।
এদিকে, ২০১৮ সালে কোম্পানিটি তার ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য রাইট শেয়ার ইস্যু করার জন্য আবেদন করে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে এটি বিএসইসির অনুমোদন লাভ করে। তবে রাইট শেয়ারের টাকা সংগ্রহের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আয় ও নিট মুনাফা কমতে শুরু করে।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বর্তমানে কোম্পানিটি ইস্যু মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। কোম্পানিটির ইস্যুমূল্য ছিল ২৫ টাকা। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৫০ টাকা। এক্ষেত্রে ইস্যুমূল্য কমেছে ১২ দশমিক ৫০ টাকা বা ৫০ শতাংশ।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটি কর-পরবর্তী নিট মুনাফা করে ১৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছিল ৪ দশমিক ৭২ টাকা। আর ২০২২ সালে গোল্ডেন হার্ভেস্ট লোকসান করে ১০ কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং শেয়ার প্রতি লোকসান করে ০ দশমিক ৪৭ টাকা। ২০২৩ সালে নামমাত্র মুনাফা করে ৩৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ইপিএস হয় ০ দশমিক ০২ টাকা। আর ২০২৪ সালে আবারও লোকসান করে ১৯ কোটি ৮৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ০ দশমিক ৯২ টাকা।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, গত তিন বছরে নামমাত্র ডিভিডেন্ড দিয়ে ক্যাটাগরি ধরে রেখেছে গোল্ডেন হার্ভেস্ট। ২০২২ সালে ২ শতাংশ ক্যাশ, ২০২৩ সালে ১ শতাংশ ক্যাশ এবং ২০২৪ সালে ১ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) কোম্পানিটির লোকসান হয়েছে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৯২ হাজার ৩৩৫ টাকা। আর শেয়ার প্রতি লোকসান করেছে ০ দশমিক ৩২ টাকা।
এদিকে গোল্ডেন হার্ভেস্ট যেখানে ব্যবসা করতে এবং ডিভিডেন্ড দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে একই খাতের এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি লিমিটেড (প্রান) ২০১৫ সাল থেকে ৩২ শতাংশ করে ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, গোল্ডেন হার্ভেস্ট একটি প্রতারক কোম্পানি। কোম্পানিটি যখন রাইট শেয়ার ইস্যুর আবেদন করে, আমি তখন সংগঠনের পক্ষ থেকে তাদের রাইট শেয়ার আবেদন বাতিল করার জন্য আহ্বান জানাই কমিশনকে। কিন্তু কমিশন আমার কথা শোনেনি। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে তা তছরুপ করেছে। লোকসানে নিমজ্জিত কোম্পানিটির প্রকৃত চিত্র এখনো ফুটে উঠেনি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে কঠোরভাবে তদন্ত হওয়া উচিত।
ব্রোকারেজ হাউজ স্টক অ্যান্ড বন্ড লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ এ.হাফিজ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা অনেক আশা নিয়ে কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। কিন্তু তালিকাভুক্তির আগে ভালো ইপিএস দেখালেও তালিকাভুক্তির পর অনেক কোম্পানি ভালো থাকে না। কোম্পানিগুলোর এধরনের আচরণ করা উচিত নয়। এজন্য কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি অডিটররাও (নিরীক্ষক) দায়ী। পুঁজিবাজার থেকে বিভিন্নভাবে টাকা উত্তোলন করে সেই অর্থ আত্মসাৎ করে কোম্পানিগুলো। গোল্ডেন হার্ভেস্ট যদি এই ধরনের কর্মকান্ড করে থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কমিশনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাইটের টাকা সঠিক সময়ে ব্যবহার না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশনের উচিত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। রাইটের অর্থ সঠিক সময়ে ব্যবহার না করা আরেকটি ছলচাতুরি।
উল্লেখ্য, গোল্ডেন হার্ভেস্ট অ্যাগ্রোর অনুমোদিত মূলধন ২১৫ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ২১ কোটি ৫৮ লাখ ৩৭ হাজার ৬২১টি, যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩১ দশমিক ৬০ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর বিদেশি ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে যথাক্রমে ০ দশমিক ৩১ শতাংশ ও ৩০ দশমিক ৪২ শতাংশ।
গোল্ডেন হার্ভেস্ট অ্যাগ্রোর তথ্য গোপন, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্ব প্রতিবেদন আকারে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে তুলে ধরা হবে। আজ তুলে ধরা হলো প্রথম পর্ব।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
































Recent Comments