মঙ্গলবার, ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভখান ব্রাদার্স: বেতনহীন কর্মী, কাগজে-কলমে কোটি টাকার মুনাফা
spot_img
spot_img

খান ব্রাদার্স: বেতনহীন কর্মী, কাগজে-কলমে কোটি টাকার মুনাফা

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে নিয়ে বিনিয়োগকারী এবং বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী গুঞ্জন ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের প্রকৃত আর্থিক ভিত্তি নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। একই সাথে আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল এবং আইনি জরিমানার মুখে পড়ে চরম বিতর্কের মধ্যে রয়েছে কোম্পানিটি। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন না দিয়ে কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির রাখার অভিযোগ, অন্যদিকে আর্থিক প্রতিবেদনে ‘ভুয়া’ মুনাফা দেখিয়ে শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী করার অভিযোগ। যেখানে কর্মকর্তারা দীর্ঘ দিন ধরে বেতনই পায়না সেখানে কোম্পানির আথিক প্রতিবেদনে দেখাচ্ছে মুনাফা। কোম্পানি উৎপাদনে রয়েছে এবং কোটি টাকা মুনাফা করেছে এই ধরণ খবর দিয়ে শেয়ার দর বারিয়ে ফায়দা নিচ্ছে আরেকটি গ্রুপ। আর তথাকথিত এই ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তথ্যমতে, বিদায়ী অর্থবছরে (৩০ জুন ২০২৫) সমাপ্ত সময়ে কোম্পানির শেয়ার প্রতি নিট সম্পদমূল্য (NAV) দাঁড়িয়েছে ১২.০৭ টাকা। অথচ পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৪১.৯০ টাকায়। অর্থাৎ, প্রকৃত সম্পদমূল্যের চেয়ে শেয়ারের বাজারদর প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। কোম্পানির মৌলিক ভিত্তির (Fundamentals) সাথে শেয়ার দরের এই চরম অসামঞ্জস্যের পেছনে কোনো কৃত্রিম কারসাজি বা জুয়াড়িদের প্রভাব রয়েছে কি না—সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, কোম্পানিটি সর্বশেষ অর্থবছরের বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল, কিন্তু অন্যদিকে কোম্পানিটির কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেন কোম্পানিটি বন্ধের উপক্রম, দীর্ঘ দিন ধরে তাদের বেতন নাই। অন্যদিকে কোম্পানি তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফা দেখাচ্ছে। যে কোম্পানি দীর্ঘ দিন ধরে কর্মকর্তাদের বেতনই দিতে পারেনা এবং উৎপাদনে নাই, সেই কোম্পানি মুনাফায় থাকে কিভাবে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন শুধু জরিমানা নয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিৎ কোম্পানি কতৃপক্ষের আসল উদ্দেশ্য খুজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করা।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বড় করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয় বিকন গ্রুপের হাত ধরে উৎপাদনে ফিরেছে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

সংবাদটি ছিল এমন, খান ব্রাদার্সের কারখানাটি বর্তমানে প্রায় ১৫০ জন কর্মীর একটি নিবেদিত কর্মী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অতীতের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, কারখানাটি অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ এবং গুণগত উৎপাদন বজায় রাখার দিকে মনোনিবেশ করে তার উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রোটোকল দিয়ে সজ্জিত, সুবিধাটি পলিপ্রোপিলিন বোনা ব্যাগ তৈরিতে অবিচ্ছিন্ন অপারেশন বজায় রাখে। ব্যবস্থাপনা দক্ষতা অনুকূলকরণ, কর্মচারী কল্যাণ নিশ্চিত এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় বাজারে গতি ফিরে পেতে তার ক্ষমতা প্রসারিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই চলমান অপারেশনটি সংস্থা এবং তার কর্মীদের স্থিতিস্থাপকতা প্রতিফলিত করে, কারণ এটি পণ্যের মান এবং সময়মত বিতরণ বজায় রাখার সময় একটি প্রতিযোগিতামূলক শিল্প ল্যান্ডস্কেপ নেভিগেট করে।

উৎপাদন এবং মুনাফার খবরের ওপর ভর করে শেয়ারের দাম যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখনই শুরু হয় কারসাজির দ্বিতীয় পর্ব—সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঘাড়ে উচ্চমূল্যের শেয়ার চাপিয়ে দেওয়া (পাম্প অ্যান্ড ডাম্প)। নেপথ্যের চক্রটি যখন নিজেদের হাতে থাকা শেয়ার চড়া দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়ে (ডাম্প করে) বাজার থেকে শত কোটি টাকা তুলে নেয়, ঠিক তখন থেকেই কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে রাখা বেলুনের মতো শেয়ারের দাম আস্তে আস্তে পড়তে থাকে। পতনের এই চক্রে পড়ে প্রতিদিনই পুঁজি হারাচ্ছেন সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা। আজ ১৩ জুলায় ২০২৬ শেয়ারটির দর এসে দাড়িয়েছে ৩৯.২০ টাকায়।

এদিকে কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খান ব্রাদার্সের বর্তমান মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও (P/E Ratio) দাঁড়িয়েছে ১৫৫.১৯ পয়েন্টে। পুঁজিবাজারের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ এর উপর পিই রেশিও গেলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়, সেখানে ১৫৫-র ওপরে পিই রেশিও থাকা মানে এই শেয়ারে বর্তমান মূল্যে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। এই চরম ঝুঁকির বিষয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি কোম্পানির অবস্থান বা বক্তব্য কী, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কোম্পানির স্বচ্ছতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার অ্যাকশন থেকে। আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের গরমিল ও জালিয়াতি করায় খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোম্পানি সচিব ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তাসহ মোট ৭ জনের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম অভাবকে নির্দেশ করে। এই অনিয়ম ও জরিমানার বিষয়ে কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব তপন কুমার সরকারকে গত ৯ জুলায় ডেইলি শেয়ারবাজারের পক্ষ থেকে কল করে জরিমানার বিষয় জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, এই বিষয়ে আমরা এখনও কিছুই জানিনা। চিঠি হাতে পেলে সেই অনুযায়ী ব্যাখ্যা দিবো।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে বছর শেষ হওয়ার নয় মাসের মধ্যে কোম্পানির কর পূর্ববর্তী মুনাফার ৫ শতাংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা দিতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফার এই অংশ ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে জমা দিচ্ছে না। নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে। শ্রমিকদের কল্যাণে গঠিত এই ফান্ডে অর্থ না দেওয়া কেবল শ্রম আইনের লঙ্ঘনই নয়, এটা শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা।

বিদায়ী বছরে কোম্পানির আয় বা রেভিনিউ বাড়ার দাবি করা হলেও কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একই সময়ে কোম্পানির ফুয়েল এক্সপেনসেস বা জ্বালানি খরচ কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। উৎপাদন বাড়লে বা আয় বাড়লে জ্বালানি খরচ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এখানে খরচ নাটকীয়ভাবে কম দেখিয়ে মুনাফা বেশি দেখানোর কোনো চেষ্টা করা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানান খাত সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণত কোম্পানির ব্যবসা ও আয় বাড়লে প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু খান ব্রাদার্সের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বিদায়ী বছরে কোম্পানির আয় বাড়লেও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এক্সপেনসেস কমেছে ৩৫ শতাংশ। কৃত্রিমভাবে মুনাফা (Profit) বাড়িয়ে দেখানোর উদ্দেশ্যে খরচের খাতা কাটছাঁট করে এই হিসাব মেলানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,  বিদায়ী বছরে সম্পদ অধিগ্রহণ (Asset Acquisition) বাবদ কোম্পানিটি ১ কোটি ৩০ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় দেখিযেছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং কোম্পানির বর্তমান আর্থিক সংকটের মাঝে ঠিক কী কী সম্পদ কেনা হয়েছে এবং এই ক্রয়ের যৌক্তিকতা কতটুকু—তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি জানান বিনিয়োগকারীরা।

এই প্রসঙ্গে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশের বাহিরে আছেন এবং কোম্পানি সচিব তপন কুমার সরকারের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে সচিব তপন কুমারকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কোম্পানি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনামুল কবির খানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এদিকে কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মো. আজিজুল জব্বারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই কোম্পানি এখন আমাদের হাতে নাই। এটা বিক্রি হয়ে গেছে। ওখানে তপন বাবু আছে উনি সবকিছু দেখেন। উনি এখন সিএফও হিসেবে দায়িত্বে আছেন কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমি না থাকার মতো। কোম্পানি এখন চলে না। সিএফওর দায়িত্বে এখন কেউ নাই। কেউ এখন দেখে না। কোম্পানি বিকন গ্রুপ নিয়েছে। কোম্পানিটি  এখন বন্ধের উপক্রম, দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের বেতন নাই। কোম্পানি মুনাফায় রয়েছে কিন্তু আপনারা বেতন পাননা? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর দেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এই কোম্পানির এমডি ও চেয়ারম্যান আছে ঠিকই কিন্তু তারা ভাসমান। আমরা দীর্ঘদিন বেতন পায়না। মুনাফায় থাকলে বেতন দেয়না কেন তাদের প্রশ্ন করেন।

খান ব্রাদার্সের কোন কর্মকর্ত এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা না বলায় পরবর্তীতে বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সচিব মো. এমরোজ হোসেনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আপনার যা খুশি তাই লেখেন। আমার কোন উত্তর নাই।

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে, বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ, সিএফও এবং সচিবকে জরিমানা করা হয়েছে।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলমগীর হোসেন ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, খান ব্রাদার্সের মতো নিম্নমানের কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে বাজারের আজ বেহাল দশা। বাজারের কোনো গ্রোথ হচ্ছে না। এ সমস্ত কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনে গোঁজামিল দিয়ে, ফুলিয়ে-ফাপিয়ে দেখাচ্ছে। বাস্তবতার সাথে যার কোনো সামঞ্জস্য নেই। উৎপাদন ভালো না, ডিভিডেন্ড নিয়ে তালবাহানা করে। এ সমস্ত নিম্নমানের কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষ পয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। (চলবে)

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম

 

 

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments