ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: স্মরণকালের ভয়াবহ ঋণ খেলাপিতে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। শুধু তাই নয়, শত কোটি টাকার অধিক লোকসান করা কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) প্রদান না করলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস ঠিকই বাড়িয়েছে অর্ধ শত কোটি টাকা। এতে করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাভবান হলেও ব্যাংকের প্রাণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুধু মাত্র ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সালেই ২১ হাজার ২৮২ কোটি ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৭২০ টাকা বা ৬৪৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়েছে। এছাড়াও ব্যাংকটির স্টেটরি রিজার্ভে প্রায় হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকলেও সে-ব্যাপারে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক) রফিকুল ইসলাম। ব্যাংকটির এই পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের ভাগ্যে কি রয়েছে এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্রটি জানায়, বর্তমানে আইএফআইসি ব্যাংকের স্টেটরি রিজার্ভে রয়েছে ৯৪৫ কোটি ৬৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৫৬ টাকা। আর কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন রয়েছে এক হাজার ৯২২ কোটি ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭০ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রুলস অনুযায়ী যেকোনো ব্যাংকের স্টেটরি রিজার্ভ অবশ্যই পরিশোধিত মূলধনের সমান হতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে স্টেটরি রিজার্ভে ঘাটতি রয়েছে ৯৭৬ কোটি ৪৪ লাখ ৯৪ হাজার ৬১৪ টাকা।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ভায়োলেট (লঙ্ঘন) করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে রফিকুল ইসলাম বলেন, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত বছরে আইএফআইসি ব্যাংকের স্টেটরি রিজার্ভে ঘাটতি থাকলেও চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন,২০২৫) পূরণ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও স্টেটরি রিজার্ভের ঘাটতি পূরণ করেনি আইএফআইসি ব্যাংক।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে আইএফআইসি ব্যাংকের মোট ঋণ খেলাপি (ক্লাসিফায়েড লোন) এসে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৫৮৫ কোটি ৬১ লাখ ২৭ হাজার ৩০৮ টাকা। আগের বছর যা ছিল ৩ হাজার ৩০৩ কোটি ৪৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ঋণ খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে ২১ হাজার ২৮২ কোটি ১৬ লাখ ৩১ হাজার ৭২০ টাকা বা ৬৪৪ শতাংশ।
আইএফআইসি ব্যাংকের মুখপাত্র রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ নিয়েছে মূলত সিলভা গ্রুপ, নাসা গ্রুপসহ অন্যান্য শিল্পপতিরা। এসব গ্রুপের যারা কর্ণধার তাদের অনেকেই বর্তমানে জেলে রয়েছেন। তাদের অনেকের কারখানা বন্ধ রয়েছে। আবার অনেকেই ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকায় ঠিকমতো ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে পারেননি। যে-কারণে ঋণ খেলাপি বেড়েছে।
তবে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। তারা বলেন, আইএফআইসি ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ নিয়েছেন বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যন্ত আস্থাভাজন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। এই অর্থ তিনি পরিশোধ না করে বিদেশে পাচার করেছেন। যে-কারণে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ খেলাপি বেড়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, আইএফআইসি ব্যাংকের ঋণ খেলাপি বাড়লেও এর বিপরীতে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সম্পূর্ণ রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ঋণ খেলাপির বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখা উচিত ছিল ১৯ হাজার ৮৯৯ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৬৬ টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি রেখেছে এক হাজার ৩৪২ কোটি ৮১ লাখ ৬২ হাজার ৮২৬ টাকা। এক্ষেত্রে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ১৮ হাজার ৫৫৭ কোটি ২ লাখ ৬২ হাজার ৮৪০ টাকা।
এদিকে প্রভিশন ঘাটতির পাশাপাশি ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ১০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা লোকসান করেছে। সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে দশমিক ৬৩ টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানটি ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত বছরের জন্য বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) প্রদান করেনি।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ হিসাব বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-বোনাস পেয়েছে ৪৯১ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৪৪০ কোটি ৫৭ লাখ ৯ হাজার ৩৬৫ টাকা। বছরের ব্যবধানে তাদের বেতন বোনাস বেড়েছে ৫০ কোটি ৮২ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯৪ টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রাণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে রেখে ও বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড প্রদান না করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস অর্ধশত কোটি টাকার অধিক বাড়ানোকে অসামঞ্জস্যতা ও অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ বলছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
আইএফআইসি ব্যাংকের ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেট রেশিও (CRAR) ২০২৪ সালে মাত্র ৭ দশমিক ২৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছর যা ছিল ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে CRAR সাড়ে ১২ শতাংশের নিচে হলেই সেই ব্যাংক ভালো অবস্থায় নেই বলে ধরে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আইএফআইসি ব্যাংকও ভালো অবস্থায় নেই।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ব্যাংকগুলো এতোদিন প্রভাবিত হয়ে ঋণ খেলাপির পুরো চিত্র প্রকাশ করেনি। তবে এখন ঋণ খেলাপির সঠিক চিত্র উঠে আসছে। কারণ অন্তর্বতী সরকার ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে অধিক সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ঋণ নেওয়া আসলে অবৈধ কিছু না। কিন্তু ডিউ ডেলিজেন্স ফলো (অনুসরণ) না করে ঋণ নেওয়া এবং তা পরিশোধ না করা হচ্ছে অপরাধ। সালমান এফ রহমান প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে, যে পরিমাণ ঋণ তাঁর নেওয়ার কথা না।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
























Recent Comments