শনিবার, ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeএক্সক্লুসিভঋণে জর্জরিত বিএসআরএম স্টিলস: এন্টারটেইনমেন্ট খরচে রেকর্ড, হতাশ বিনিয়োগকারীরা (পর্ব-১)
spot_img
spot_img

ঋণে জর্জরিত বিএসআরএম স্টিলস: এন্টারটেইনমেন্ট খরচে রেকর্ড, হতাশ বিনিয়োগকারীরা (পর্ব-১)

নিজস্ব প্রতিবেদক: সুদজনিত ব্যয়ে হেলে পড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ স্মরণকালের রেকর্ড পরিমাণ খরচ করেছে। যা শুনে-দেখে অবাক, আশ্চর্য ও হতাশ হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তাদের মতে, কোম্পানিটির যেখানে সুদজনিত ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে এবং তা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বিনিয়োগকারীদের অর্থ এভাবে এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ করে নির্বুদ্ধিতা, অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে কোম্পানিটি।

বিনিয়োগকারীরা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে আরও বলেছেন, আসলেই কি প্রতিষ্ঠানটি এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ এতো টাকা খরচ করেছে? নাকি এন্টারটেইনমেন্টের মিথ্যা খরচ বা ভাউচার দেখিয়ে সেই অর্থ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিজেদের পকেটে ঢুকিয়েছে?। সঠিকভাবে তদন্ত করলেই বেড়িয়ে আসবে থলের বিড়াল।

(বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ করেছে ৮ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার ২৫২ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল এক কোটি ৯৫ লাখ ৬৯ হাজার ৪৮২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে যা বেড়েছে ৬ কোটি ২২ লাখ ৫৯ হাজার ৭৭০ টাকা বা ৩১৮ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, তালিকাভুক্ত পরবর্তী গত ১৬ বছরের মধ্যে সদ্য বিদায়ী বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ এন্টারটেইন বাবদ খরচ দেখিয়েছি বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের মনে সন্দেহ ঢুকেছে এবং প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ আসলেই কি এতো বেশি হয়েছে, নাকি এখানে রয়েছে অন্য কিছু?

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণ বাবদ খরচ করেছে এক হাজার ৬৩৫ কোটি ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২৫ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ১২৫ কোটি ২৬ লাখ ২৫ হাজার ১২১ টাকা। বছরের ব্যবধানে অধিগ্রহণ বাবদ খরচ বেড়েছে এক হাজার ৫১০ কোটি এক লাখ ৬৫ হাজার ৪ টাকা বা ১২০৫ শতাংশ।

কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নুরুল করিম লিখিত বক্তব্যে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে জানান, আমাদের সম্মানিত কাস্টমারদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আমরা মিরেশ্বরাইতে বাৎসরিক ছয় লক্ষ মেট্রিক টন ক্যাপাসিটির নতুন রোলিং মিল স্থাপন করেছি। যেকারণে সদ্য বিদায়ী বছরে স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণ বাবদ খরচ বেড়েছে।

এদিকে, এই স্থায়ী সম্পদ অধিগ্রহণ বাবদ কোম্পানির দেখানো খরচ আদৌ সঠিক কিনা সেব্যাপারে পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি লোন বা ঋণ নিয়েছে ২ হাজার ২২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫১ হাজার ১৮২ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৮৪৪ কোটি ২১ লাখ ৫৯ হাজার ২৪৭ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের দীর্ঘমেয়াদী লোন বেড়েছে এক হাজার ৩৮০ কোটি ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৩৫ টাকা বা ১৬৩ শতাংশ। এছাড়াও উল্লেখিত বছরে প্রতিষ্ঠানটির ফাইন্যান্স কস্ট বা সুদজনিত ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা বা ৩৪ শতাংশ।

এব্যাপারে নুরুল করিম জানান, আমাদের নতুন রোলিং মিল প্রজেক্ট এর জন্য আমরা ২১০০ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করেছি। ফাইন্যান্স কস্ট-এ এই দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ছয় মাসের সুদ অন্তর্ভুক্ত আছে। যার কারনে আমাদের ফাইন্যান্স কস্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদজনিত ব্যয় যত বাড়বে কোম্পানির ব্যবসায় তত বেশি নেগেটিভ বা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাই কোম্পানিগুলোর উচিত ঋণের পরিমাণ কমিয়ে সুদজনিত ব্যয়ের পরিমাণ কমানো। কিন্তু অনেক কোম্পানি সেটি করে না। উচ্চাবিলাসি পজেক্ট হাতে নেয়। এই প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে গিয়েও কোম্পানিগুলো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সেই প্রজেক্ট থেকে কাঙ্খিত ফল না আসলে কোম্পানি ঋণ খেলাপিতে পড়ে যায়। ব্যবসায় ধস নামে। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

এদিকে এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ অতিরিক্ত খরচের ব্যাপারে কোনো লিখিত বক্তব্য দেয়নি নুরুল করিম। তবে তিনি মৌখিকভাবে বলেন, সদ্য বিদায়ী বছরে ডিলারদেরকে একত্রিতো করে অনুষ্ঠান করা হয়েছে। গত কয়েক বছর যা করা হয়নি। যেকারণে এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ বেড়েছে।

আপনাদের এ ব্যাপারে খরচ ৩১৮ শতাংশ বেশি দেখিয়েছেন, এর সত্যতা কতটুকু? এব্যাপারে আপনাদের অডিট রিপোর্টেতো কোনো কিছু উল্লেখ করেননি। শুধু টাকার অঙ্ক উল্লেখ করেছেন। খরচের অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় কেন উল্লেখ করেননি? আপনাদের যে সত্যিই এতো টাকা খরচ হয়েছে, সেটি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিভাবে বুঝবে? কম খরচ করে আপনারাতো বেশি খরচও দেখাতে পারেন। এসব কথা সিএফওকে জানানো হলে তিনি বিষয়টি এড়িযে যান।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ যে খরচ দেখিয়েছে তার অধিকাংশই ভুয়া। এখন অনলাইন প্রায় সব কিছু হয়। কোম্পানির খরচ এতো বেশি হওয়ার কথা নয়। এই এন্টারটেইনমেন্ট বাবদ খরচ বেশি দেখিয়ে কোম্পানিটি তা আত্মসাৎ করেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসির) উচিত নতুন করে অডিটর নিয়োগ করে এব্যাপারে তদন্ত করা।

উল্লেখ্য, কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৩৭৫ কোটি ৯৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৭২ দশমিক ০৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৮ দশমিক ৫২ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে দশমিক ২৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments