ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) কর্মদক্ষতা পরিমাপের জন্য নতুন মূল্যায়ন কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে পাঁচটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে এমডিদের মোট ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন করা হবে।
এই মূল্যায়নের ফলাফল শুধু পারফরম্যান্সের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংশ্লিষ্ট এমডির নিয়োগ, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বৃদ্ধি, বেতন-ভাতা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যায়নের ফল বিবেচনা করা হবে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে এ বিষয়ে নির্দেশনা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।নতুন কাঠামো অনুযায়ী, প্রতিটি এমডির কর্মদক্ষতা ছয় মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
বর্তমানে দায়িত্বে থাকা এমডিদের ক্ষেত্রে প্রথম মূল্যায়নকাল ধরা হয়েছে আগামী অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এরপর কোনো নতুন এমডি দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার দায়িত্ব নেওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
অর্থাৎ, এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এখন আর শুধু সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে না; নির্দিষ্ট সূচকে আগের সময়ের তুলনায় কতটা অগ্রগতি হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কাঠামোতে মোট পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গিতে ১০০ নম্বর রাখা হয়েছে।
প্রথমত, মূলধন, তারল্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—২৫ নম্বর।ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা, জরুরি পরিস্থিতিতে তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংকের সক্ষমতা এই অংশে মূল্যায়ন করা হবে।
দ্বিতীয়ত, ঋণের মান ও আদায়—২৫ নম্বর।খেলাপি ঋণ কমানো, অবলোপন করা ঋণ আদায় এবং শীর্ষ ২০ ঋণগ্রহীতার কাছে ঋণের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তৃতীয়ত, সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণ—২৫ নম্বর।বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন-সংক্রান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
চতুর্থত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—১৫ নম্বর।সিএমএসএমই ও কৃষিঋণ বিতরণ, গ্রিন ফাইন্যান্সের প্রসার, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির মতো বিষয় এখানে গুরুত্ব পাবে।
পঞ্চমত, মুনাফা ও পরিচালন দক্ষতা—১০ নম্বর।ব্যাংকের মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা এবং পরিচালন ব্যয় কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, এই অংশে তার মূল্যায়ন করা হবে।
প্রতিটি ব্যাংককে আগের ছয় মাসের পারফরম্যান্স বিবেচনায় পরবর্তী ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত সূচকে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে।
এই লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনের পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের পরই নির্ধারিত লক্ষ্য চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।এর ফলে ব্যাংকের এমডির মূল্যায়নে এমন কোনো লক্ষ্য নির্ধারণের সুযোগ কমবে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিটি সূচকে ন্যূনতম ৫০ শতাংশ লক্ষ্য অর্জনের বাধ্যবাধকতা।কোনো এমডি নির্ধারিত কোনো সূচকে লক্ষ্যমাত্রার ৫০ শতাংশের কম অর্জন করলে ওই সূচকে তিনি কোনো নম্বর পাবেন না।শুধু তাই নয়, ব্যাংকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত পেনাল্টির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঋণ-আমানত অনুপাত, খেলাপি ঋণের অনুপাত, ঋণ আদায় এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে কোনো এমডি ৫০ শতাংশের কম অর্জন করলে বা শূন্য পেলে তার মোট অর্জিত নম্বর থেকে নির্দিষ্ট হারে নম্বর কেটে নেওয়া হবে।
অর্থাৎ কোনো এমডি অন্য কয়েকটি ক্ষেত্রে ভালো করলেও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হলে তার সামগ্রিক স্কোর কমে যেতে পারে।৭৫ পেলেই ‘গড়পড়তার চেয়ে ভালো’, ১০০ নম্বরের এই মূল্যায়নে তিনটি স্তরে এমডিদের পারফরম্যান্স বিবেচনা করা হবে।৭৫ বা তার বেশি: গড়পড়তার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স, ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম: গড়পড়তা পারফরম্যান্স ফলে একজন এমডির জন্য শুধু মুনাফা করাই যথেষ্ট হবে না। ঋণের মান, খেলাপি ঋণ, তারল্য, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং গ্রাহকসেবাসহ একাধিক ক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে হবে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়।
নতুন মূল্যায়ন কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক মূলত ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতা আরও স্পষ্ট করতে চাইছে। একজন এমডির সময়ে ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি উন্নত হচ্ছে কি না, ঝুঁকি কমছে কি না এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কি না—এসব বিষয় এখন তুলনামূলকভাবে পরিমাপযোগ্য হবে।
নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যাংকের এমডিদের দায়িত্বও আরও ফলাফলনির্ভর হয়ে উঠবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ঋণ আদায়, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের মতো বিষয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স সরাসরি মূল্যায়নের স্কোরে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে ভালো পারফরম্যান্স করা এমডিদের জন্য এটি ইতিবাচকও হতে পারে। কারণ নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হলে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে পরিমাপযোগ্য ফলাফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ১০০ নম্বরের কাঠামো ব্যাংকের এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হয় এবং এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমস্যা কতটা কমানো সম্ভব হয়।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ
































Recent Comments