নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে নিজেদেরকে শীর্ষ মোবাইল অপারেটর কোম্পানি হিসেবে দাবি করা গ্রামীণফোনের মুনাফা আশঙ্কাজনক হারে কমলেও স্বল্প মেয়াদী লোন বা ঋণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিকমিউনিকেশন খাতের কোম্পানিটির লোন বৃদ্ধিকে মোটেও ভালোভাবে নিচ্ছেন না সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে শুধু যে লোনের পরিমাণই বেড়েছে তাই নয়, গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পরিমাণও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই কোম্পানিটির ব্যবসা তলানীতে গিয়ে ঠেকবে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) গ্রামীণফোনের মুনাফা কমেছে ১৯ শতাংশ। আর স্বল্পমেয়াদী লোন বেড়েছে ৪০ শতাংশ। ৩০ জুন ২০২৪ সালে কোম্পানির স্বল্পমেয়াদী লোন ছিলো ৫০০ কোটি টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭০০ কোটি টাকা। এক্ষত্রে এক বছরের ব্যবধানে লোন বেড়েছে ২০০ কোটি টাকা।

এ ব্যাপারে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, লোন বৃদ্ধি করেও যদি মুনাফা বাড়াতে না পারে তবে সেই লোন পরিশোধে হিমশিম খেতে হবে গ্রামীণফোনকে। ইতিমধ্যে হিমশিম খেতে শুরু করেছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটির ঘোষিত লভ্যাংশের (ডিভিডেন্ড) পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে, যা নিয়ে কানাঘুষা শুরু করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এছাড়াও কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
(গ্রামীণফোন নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো দ্বিতীয় পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে তৃতীয় পর্ব।)
সদ্য বিদায়ী বছরে গ্রামীণফোন বিনিয়োগকারীদের জন্য ৩৫ শতাংশ কম ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, যা কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে। অর্থাৎ লোন বৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীক দুর্বলতার কারণে গ্রামীণফোনের বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত ডিভিডেন্ডের পরিমাণ কমেছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।


এদিকে, গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানির অর্থ প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্যহারে।
জানা গেছে, গত বছর (৩০ জুন ২০২৪) গ্রামীণফোন তার গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে ১৫ হাজার ৯৪৫ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮১৭ কোটি ৩৭ লাখ এক হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানির অর্থ প্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে ১২৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা।

এভাবে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ কমতে থাকলে খুব শিগগিরিই কোম্পানিটির তারল্য সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
গ্রামীণফোনের সদ্য বিদায়ী বছরে সাত কোটি টাকার অধিক সুদজনিত আয় কমেছে। অর্থাৎ মূল ব্যবসার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবসাতেও আশানুরুপ ফলাফল দেখাতে পারেনি কোম্পানিটি।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর গ্রামীণফোনের সুদজনিত আয় হয়েছিল ৭১ কোটি ৫৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৩ কোটি ৮১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুদজনিত আয় কমেছে ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৫৩ হাজর টাকা বা ১১ শতাংশ।

এসব ব্যাপারে জানতে গ্রামীণফোনের সচিব এস.এম. ইমদাদুল হককে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে কোম্পানির আরেক কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করেন। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানির প্রফাইলে সচিব এস. এম ইমদাদুল হকের মোবাইল নাম্বার দেওয়া থাকলেও তিনি তা কখনই রিসিভ (ধরেন) করেন না। গণমাধ্যম কর্মী, সাধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে কারো ফোনেই তিনি ধরেন না। ধরেন কোম্পানির অন্য কর্মকর্তা। এতে করে সকলের মনে প্রশ্ন জেগেছে আদৌ কি এই নামে কোম্পানিটিতে সচিব রয়েছে? নাকি এই পদে অনভিজ্ঞ, দুর্বল মানের ব্যক্তিকে বসিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে গ্রামীণফোন, যে-কারণে তিনি ফোন রিসিভ করেন না।
এছাড়াও কোনো গণমাধ্যম কর্মী উল্লেখিত নাম্বারে ফোন দিলে কোম্পানির অন্য কর্মকর্তা ফোন ধরে একটি পিআর ফার্মের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে পিআর ফার্মের ওই ব্যক্তির মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকেও কোনো সদত্তোর পাওয়া যায় না। শুধু কালক্ষেপন করেন ওই ব্যক্তি। কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর দেন না তিনি।
এদিকে সম্প্রতি গ্রামীণফোন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে যে, চলতি ২০২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানির রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে পারে।
কোম্পানিটির এমন বক্তব্যে সত্যিই হতাশ হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তারা বলেন, গ্রামীণফোন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। এমন একটি কোম্পানি প্রান্তিক শেষ হওয়ার আগেই তাদের আর্থিক দুর্বলতা তুলে ধরেছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এমনও হতে পারে আর্থিক দুর্বলতা দেখিয়ে কোম্পানি মুনাফার অর্থ বিদেশে পাঁচার করার পায়তারা করছে না তো?
উল্লেখ্য, গ্রামীণফোনের পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ৩৫০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যেখানে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (অন্যান্য বিনিয়োগকারী ব্যতিত) মালিকানা রয়েছে ৯০ শতাংশ। আজ গ্রামীণফোনের শেয়ার দর ২৪৩ টাকা ৩০ পয়সা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
























Recent Comments