ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন বিধিমালা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত বিধিমালায় জীবনবীমা খাত ছাড়া অন্যান্য সব খাতের মার্জিন-সুবিধাযোগ্য শেয়ারের সর্বোচ্চ মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও ৪০ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ক্ষেত্রে আলোচিত প্রাইস-টু-বুক (পিবি) রেশিওর শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিএসইসির নিয়মিত সভায় সংশোধিত মার্জিন ঋণ বিধিমালা অনুমোদন করা হয়। বিধিমালার চূড়ান্ত কাজ শেষ করে আগামী ১৩ আগস্ট গেজেট প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে। গেজেট প্রকাশের আগে বিধিমালার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম জানিয়েছেন, মার্জিন ঋণের নতুন বিধিমালা সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
পিই রেশিও হবে প্রধান মানদণ্ড
সংশোধিত বিধিমালায় মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে পিই রেশিওকে অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবে রাখা হয়েছে। ব্যাংক, নন-লাইফ বীমা এবং অন্যান্য খাতের কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পিই রেশিও ৪০ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো কোম্পানির শেয়ারের পিই রেশিও ৪০-এর বেশি হলে সেটি মার্জিন ঋণের আওতায় আসবে না। তবে জীবনবীমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে এই পিই সীমা প্রযোজ্য হবে না।
নতুন বিধিমালায় প্রথমবারের মতো ট্রেইলিং পিই রেশিও ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, কোনো শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্যকে সর্বশেষ ১২ মাসে কোম্পানির অর্জিত শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসের সঙ্গে তুলনা করে পিই রেশিও নির্ধারণ করা হবে।
কোম্পানি নতুন ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের পিই রেশিওও হালনাগাদ হবে।
বাদ পড়ল পিবি রেশিও
মার্জিন ঋণের যোগ্যতা নির্ধারণে ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির জন্য প্রাইস-টু-বুক বা পিবি রেশিওর শর্ত বাদ দিয়েছে বিএসইসি।
এর আগে প্রকাশিত খসড়া বিধিমালায় ব্যাংকের শেয়ারের জন্য সর্বোচ্চ পিবি রেশিও ৩ এবং বীমা কোম্পানির জন্য ১ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে সংশোধিত বিধিমালায় এই শর্ত রাখা হয়নি।
খসড়া বিধিমালা প্রকাশের পর এর প্রভাব পুঁজিবাজারেও দেখা যায়। মার্জিন-সুবিধাযোগ্য কয়েকটি শেয়ারের দামে উল্লেখযোগ্য সমন্বয় হয়েছিল। তখন বাজারসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করেছিলেন, পিবি রেশিওর শর্ত কার্যকর হলে এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চূড়ান্ত বিধিমালায় পিবি রেশিওর শর্ত বাদ দেওয়ায় সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মার্জিন কলের নিয়মেও পরিবর্তন
নতুন বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন কল এবং শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে আগের খসড়ার তুলনায় কিছুটা বেশি সুযোগ রাখা হয়েছে।
কোনো বিনিয়োগকারীর ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে তাকে আগাম নোটিশ দিতে হবে। এরপর ইক্যুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই বিনিয়োগকারীর শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করতে পারবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান।
এর আগে খসড়া বিধিমালায় ইক্যুইটি ৭০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে মার্জিন কল দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিনিয়োগকারীকে প্রয়োজনীয় ইক্যুইটি পুনঃস্থাপনের জন্য তিন কার্যদিবস সময় দেওয়ার কথাও ছিল। একই সঙ্গে ইক্যুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই শেয়ার বিক্রির সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল।
চূড়ান্ত বিধিমালায় সেই সীমা পরিবর্তন করে ৫০ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
কোন শেয়ার মার্জিন সুবিধা পাবে না
নতুন নিয়মে সব ধরনের তালিকাভুক্ত শেয়ার মার্জিন ঋণের আওতায় আসছে না।
‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ ক্যাটাগরির শেয়ার মার্জিন সুবিধার বাইরে থাকবে। একইভাবে এসএমই, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও মার্জিন ঋণের জন্য অযোগ্য থাকবে।
ফলে মূল বাজারের ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির যোগ্য শেয়ারগুলোই মূলত নতুন মার্জিন ঋণ কাঠামোর আওতায় আসবে।
মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১
সংশোধিত বিধিমালায় সাধারণ সিকিউরিটিজের জন্য মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, কোনো বিনিয়োগকারী নিজের এক লাখ টাকা ইক্যুইটি বিনিয়োগ করলে যোগ্যতার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ আরও এক লাখ টাকা মার্জিন ঋণ নিতে পারবেন।
তবে জীবনবীমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে আলাদা মার্জিন ঋণ কাঠামো থাকবে।
বাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে মার্জিন-সুবিধাযোগ্য শেয়ারের পরিধি এবং বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পিবি রেশিওর শর্ত বাদ দেওয়ায় ব্যাংক ও নন-লাইফ বীমা খাতের কিছু শেয়ার নতুন করে মার্জিন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ পেতে পারে।
তবে মার্জিন ঋণের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বাড়লে বাজারে অতিরিক্ত জল্পনামূলক লেনদেন তৈরি হতে পারে। আবার বাজারে বড় ধরনের দরপতন হলে বিনিয়োগকারীদের ইক্যুইটি দ্রুত কমে গিয়ে শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে একসঙ্গে অনেক বিনিয়োগকারীর শেয়ার বিক্রি হলে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ার পাশাপাশি অস্থিরতাও তীব্র হতে পারে। তাই নতুন বিধিমালায় একদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হলেও, অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে যোগ্যতা ও ইক্যুইটির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম
































Recent Comments