নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই প্ল্যাটফর্মের মামুন এগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড কাগজে-কলমে মুনাফা বেশি দেখালেও প্রতিষ্ঠানটির হাতে আসা নগদ অর্থের পরিমাণ কমেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিটির ব্যবসায়িক সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, কোম্পানির কাছে থাকা নগদ অর্থের ওপর নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সক্ষমতা। কাগজে-কলমে অনেক কোম্পানি মুনাফা বেশি দেখাতেই পারে। কিন্তু বাজার থেকে নগদ অর্থ আদায় যদি দেখানো মুনাফার চেয়ে কম হয় বা দুর্বল হয় তবে, সেই প্রতিষ্ঠান মোটেও ব্যবসায়িকভাবে সফল নয়। নগদ অর্থই কোম্পানির মূল ভিত্তি।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত হিসাব বছরে (৩০ জুন ২০২৪) মামুন এগ্রোর কাগজে কলমে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে (ইপিএস) এক টাকা ২০ পয়সা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে এক টাকা ২১ পয়সা। অর্থাৎ দশমিক ০১ টাকা ইপিএস বেড়েছে।
(মামুন এগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো দ্বিতীয় পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে তৃতীয় পর্ব।)
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কাগজে কলমে মুনাফা বেশি দেখালেও বাস্তবিক অর্থে নগদ অর্থ সংগ্রহে সফলতা দেখাতে পারেনি কোম্পানিটি।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানিটি গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ সংগ্রহ করেছে ৫২ কোটি ১১ লাখ ৫ হাজার ৭৭ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৫৬ কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৮ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থ সংগ্রহ কমেছে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ২২১ টাকা বা ৭ শতাংশ।
তারল্য সংকটে থাকা মামুন এগ্রোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ ধারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানিটির অর্থ ধারের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫১ লাখ ৩ হাজার ৩০৯ টাকা। আর এর আগের বছর যা ছিল ২৭ লাখ ৭৩ হাজার ৪০০ টাকা। বছরের ব্যবধানে ধারের পরিমাণ বেড়েছে ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৯০৯ টাকা বা ৮৪ শতাংশ।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানায়, তালিকাভুক্তির প্রায় ৪ বছর যেতে না যেতেই মামুন এগ্রো তারল্য সংকটের বেড়াজালে পড়েছে। ফলে তারল্য সংকট মেটাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ধার নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যা কোম্পানিটির জন্য মোটেও ভালো কোনো লক্ষণ নয়।
তারা আরও জানায়, সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরকে নানারকম রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালিকাভুক্ত হয় মামুন এগ্রো। সেসময় ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধিসহ ভবিষ্যতে নানা রকম অগ্রগতি হবে বলে বিনিয়োগকারীদের জানায় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তালিকাভুক্ত পরবর্তী কোম্পানিটির ব্যবসার অগ্রগতি বা মুনাফাতো বাড়েইনি উপরন্তু তারল্য সংকটে পড়েছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারে আসেই মূলত অর্থ আত্মসাৎ করার জন্য। সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা কোন পর্যায়ে রয়েছে তা তদন্ত করা উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)।
এদিকে খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোম্পানিটির ব্যবসায়িক অবনতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যেকারণে কোম্পানিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন তারা।
এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়েছেন ২৭ শতাংশ। ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে তাদের মালিকানা ছিল ৬০ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর ৩০ জুন ২০২৫ হিসাব বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৪ দশমিক ০২ শতাংশ।

জানা গেছে, কোম্পানিটি থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় শেয়ার দর কমেছে আশঙ্কাজনকহারে। আগামীতে শেয়ার দর আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, গত এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে ৪৩ শতাংশ। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৩৫ টাকা ৩০ পয়সা। আর আজ (১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫) শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ২০ টাকা ১০ পয়সা। বছরের ব্যবধানে শেয়ার দর কমেছে ১৫ টাকা ২০ পয়সা।
এসব ব্যাপারে জানতে মামুন এগ্রোর প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আব্দুর রব-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমি নিউজের কোনো বিষয়ে কথা বলতে পারবো না। আপনার যেভাবে মন চায় আপনি নিউজ করেন।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, মামুন এগ্রোর মতো বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে যারা ব্যবসায়িকভাবে ভালো অবস্থায় নেই। তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে নানা রকম গোজামিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা নিরীক্ষকরা নামমাত্র নিরীক্ষা করে থাকে। কোম্পানি থেকে প্রভাবিত হয়ে নিরীক্ষকরা এই কাজটি করে থাকে। বিএসইসির উচিত মামুন এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেন পুনরায় তদন্ত করা। তাহলে কোম্পানির অনেক গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। বিনিয়োগকারীরাও কোম্পানিটির দুরবস্থার সঠিক কারণ জানতে পারবে।
উল্লেখ্য, মামুন এগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেডের পরিশোধিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৬৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।





















Recent Comments