শনিবার, ২৭শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeখেলা-ধুলাবাঁকা চোখের জবাব মাঠে দিতে চান মেসিরা
spot_img
spot_img

বাঁকা চোখের জবাব মাঠে দিতে চান মেসিরা

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: কানসাসের আকাশটা আজ ক’দিন ধরেই কেমন যেন গুমোট। দূরের মিসৌরি নদীর দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসটায় কোনো ঠান্ডা পরশ নেই, উল্টো এক অদ্ভুত চঞ্চলতা। এ শহরে আসা একদল ব্রিটিশ সাংবাদিক মিসর ম্যাচের সেই রেফারি বিতর্ক, সেই ছাইচাপা ক্ষোভের আগুনটাকে বারবার খুঁচিয়ে উস্কে দিতে চাইছেন। চারপাশে তাদের কত কথা, কত ফিসফাস, কত রকমের বাঁকা চাহনি!

বিশ্ব ফুটবলের তথাকথিত পণ্ডিতরা যখন আর্জেন্টিনার দিকে সংশয়ের আঙুল তুলছেন, লিওনেল মেসির ড্রেসিংরুম তখন চেনা কানাগলি পেরিয়ে এক স্পর্ধিত দ্রোহের আগুনে জ্বলছে। অ্যারোহেডের ড্রেসিংরুমে এখন একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে–প্রতিশোধ। না, কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো পুরোনো শত্রুতা নয়; এ প্রতিশোধ আসলে চারপাশের ওই শ্যেনচক্ষু আর নিন্দুককুলের বাঁকা চাহনির বিরুদ্ধে।

কানসাসের বেস ক্যাম্পে এসে মেসি আর তাঁর দলের বাকিদের মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায় নিন্দুকের দল কুৎসার যে জাল বিছিয়েছে, তাকে এক লহমায় অবজ্ঞা করার এক রাজকীয় ঔদাসীন্য আছে এই নীল-সাদা শিবিরে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে এই আর্জেন্টিনা তো শুধু ম্যাচ জিততে নামেনি, তারা নেমেছে নিজেদের আত্মসম্মানের এক অগ্নিশুদ্ধিতে। সমস্ত কোলাহল, সমস্ত বিতর্ককে বুটের তলায় পিষে দিয়ে অ্যারোহেডের সবুজ ঘাসে আজ তারা এক নিজস্ব দাপটের রূপকথা লিখতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রুদ্বশ্বাস ম্যাচের লাইফলাইনগুলো কেন প্রতিবার কেবল একা লিওনেল মেসিকেই দিতে হবে? মেসি না হয় ক্যানভাসে ছবি এঁকে দিতে পারেন, কিন্তু বাকিদের তুলিগুলো কেন এত বিবর্ণ? কানসাসের প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে স্কালোনির মুখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাঁর আসল ছটফটানিটা এই অতিমাত্রায় মেসিনির্ভরতা থেকে কাটিয়ে ওঠা নিয়ে।

মিসর ম্যাচে যখন মাঝমাঠের ডি পল আর ম্যাক অ্যালিস্টারের সেই চেনা পাসিংয়ের ছন্দটা আচমকা হারিয়ে গেল, তখনই মাঝমাঠটা যেন ছন্নছাড়া দেখাল। সমাধান? বুয়েন্স আয়ার্স থেকে আসা এক অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন সাংবাদিক মিগুয়েলের কথা ধরলে তা অনেকটা এমন–মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার ওই ধীরগতির ফুটবল ছেড়ে আরও বেশি আক্রমণাত্মক স্পেস তৈরি করতে হবে, সুইস মাঝমাঠের জমাট বরফ ভাঙার চাবুকটা নিতে হবে নিজের হাতে। আর আক্রমণভাগে লাউতারো মার্টিনেজের ওই সুযোগ নষ্টের মহড়া! গোলপোস্টের সামনে তাঁর এই শ্যেনচক্ষুর অভাব মেসিনির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ। লাউতারোকে আজ বক্সে আরও একটু ঠান্ডা মাথার ঘাতক হতে হবে, আলভারেজের সঙ্গে পজেশন অদলবদল করে সুইস ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করার রসদ জোগাতে হবে। রক্ষণভাগে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের গতি আর আগ্রাসনকে আজ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেই হবে স্কালোনিকে।

নকআউটের শেষ ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখলেও রক্ষণভাগের সামান্য অসতর্কতায় হুট করে ২ গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। কাউন্টার-অ্যাটাক সামলানোর ক্ষেত্রে রক্ষণভাগের এই ধীরগতি এবং মনোযোগ হারানো সুইসদের বিপক্ষে আরও ভয়ংকর হতে পারে। সুইজারল্যান্ড অত্যন্ত সুশৃঙ্খল রক্ষণ বজায় রেখে কাউন্টার-অ্যাটাকে ওঠার জন্য ওস্তাদ। সুইসদের জমাট ডিফেন্সের বিপক্ষে প্রথমে গোল হজম করলে ম্যাচে ফেরা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। কানসাসের বেস ক্যাম্পে মেসিদের অনুশীলন সেশন কভার করতে আসা আর্জেন্টাইনরা নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করছে এই দলটির অন্যতম একটি সমস্যা নাকি ধরা পড়েছে তাদের কোচিং ম্যানেজমেন্টের মধ্যে।

তাহলো, প্রথম আধা ঘণ্টার জড়তা আর ছন্দহীনতা। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে খেলা এবং মিসরের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপের ম্যাচ খেলার পর দলের ফুটবলারদের ওপর শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির একটা বড় ধকল গেছে। ম্যাচের শুরুতেই গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার যে প্রবণতা গত ম্যাচে দেখা গেছে, তা কাটিয়ে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া স্কালোনির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে রাইট ব্যাক নাহুয়েল মোলিনার জায়গায় শুরু থেকে দেখা যেতে পারে গঞ্জালো মন্তিয়েলকে। সেন্টার ফরোয়ার্ড পজেশনে আলভারেজের জায়গায় লাউতারোকে।

তবে যেকোনো ভাবেই হোক না কেন ম্যাচটিতে হট ফেভারিট অবশ্যই আর্জেন্টিনা। দুই দলের অতীতও সেটাই বলে। সাতবারের মুখোমুখিতে কখনোই আর্জেন্টিনাকে হারাতে পারেনি তারা। ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপ হোক কিংবা ২০১৪-এর ব্রাজিলের সেই রুদ্ধশ্বাস অতিরিক্ত সময়ে ডি মারিয়ার জাদুকরী গোল–ইতিহাস সব সময়ই আলবিসেলেস্তেদের পক্ষে রায় দিয়েছে। এমনকি সুইজারল্যান্ড কখনও কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪-এর পর এবারের ২০২৬ নিয়ে চারবার তারা কোয়ার্টারে উঠেছে। সুইসদের ইতিহাসটা আসলে ওই নিখুঁত ঘড়ির কাঁটার মতো; একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা বড্ড নির্ভুল, কিন্তু সেমিফাইনালের সেই মহাকাব্যিক চৌকাঠটা ছোঁয়ার ভাগ্য বা স্পর্ধা কোনোটিই আজ পর্যন্ত তাদের ফুটবল কপালে জোটেনি! কানসাসের মাঠে আজ মেসিদের হারিয়ে সেই অধরা ইতিহাস তারা লিখতে পারে কিনা, সেটিই দেখার।

গতকাল কানসাসের অনুশীলনে পনেরো মিনিটের জন্য তারা মিডিয়াকে আমন্ত্রল জানিয়েছিল, ভিড় জমেছিল প্রায় দেড়শ আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের। তাদের সামনে নিজেদের ফুটবল কৌশল কোনোভাবেই খোলাসা করেননি সুইসরা। যারা ভাবছেন কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড কেবলই এক অবোধ বলির পাঁঠা, তারা আসলে মস্ত বড় ভুল করছেন। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকা এই আল্পাইন বাহিনীর আক্রমণের প্রধান চাবুক হয়ে উঠেছেন ২০ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি ইয়োহান মানজাম্বি; যাঁর নামের পাশে এরই মধ্যে জ্বলজ্বল করছে ৩টি মহামূল্যবান গোল! মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা যেন সেই পুরোনো রোমান সেনাপতি; যার পাসিংয়ের নিখুঁত জ্যামিতি প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরাতে বাধ্য। আর রক্ষণভাগে ম্যানুয়েল আকানজি যেন এক দুর্ভেদ্য চীনের প্রাচীর। তাদের কোচ মুরাত ইয়াকিন ম্যাচের আগে খোঁচা দিতে ভুলেননি মেসিদের। ‘বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হওয়াটা আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। তবে আর্জেন্টিনা কিন্তু অজেয় নয়!’ তিনি যেন আকারে-ইঙ্গিতে মেসিদের ওই মিসর ম্যাচের নড়বড়ে ডিফেন্সটাকেই বিঁধতে চাইলেন। এটা ধরেই নেওয়া যায় যে গোল পোস্টের সামনে চার থেকে ছয়জনকে দাড় করিয়ে আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখার চেষ্টা করবে সুইসরা। তারা যে কোনো মূল্যে চাইবে ম্যাচটি টাইব্রেকে নিয়ে যেতে, যেমনটি তারা কলম্বোর বিপক্ষে করেছিল।

আর এসব জানা আছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কোচ স্কালোনির। তাঁর অজানা ভয় শুধু একটি জায়গাতেই সুইজারল্যান্ড দলটি কিন্তু ইউরোপের। তাদের গতি আর শারীকীয় উচ্চতা সবসময়েই অস্বতিতে রাখে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারদের। সুইসদের এই প্রাচীর ভাঙতে স্কালোনি শেষ পর্যন্ত কোন কৌশল নেবেন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

সুইজারল্যান্ডের জমাট বরফ-ডিফেন্স আজ সামনে ছক কষছে ঠিকই, কিন্তু তারা হয়তো জানে না, খাঁচায় বন্দি সিংহের চেয়েও আহত আলবিসেলেস্তেরা অনেক বেশি বিপজ্জনক। আজ শুধুই জেতা নয়, সুইস দুর্গ ভেঙে ফালাফালা করে দাপটের এক নতুন রাজকীয় আখ্যান লিখতে হবে মেসিদের। কানসাসের আকাশে আজ তাই কোনো সমঝোতার মেঘ নেই, সেখানে বাজছে শুধুই রাজকীয় দ্রোহের সুর!

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments