ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: কাউকে খুব পছন্দ করেন, কিন্তু বলতে পারছেন না। এমন সময় পেয়ে গেলেন অদ্ভুত এক ইচ্ছাপূরণের সুযোগ, বিশেষভাবে চাইলেই পছন্দের সেই মানুষটি আপনাকে ভালোবাসতে শুরু করবে! চেনা এই সহজ গল্পের সিনেমা ‘অবসেশন’ নিয়েই দুনিয়াজুড়ে হুলুস্থুল।
ইচ্ছাপূরণের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে গল্প নতুন নয়। ১৯০২ সালে প্রকাশিত ডব্লিউ ডব্লিউ জ্যাকবসের ক্ল্যাসিক ছোটগল্প ‘দ্য মাংকি’জ প’এই ধারণার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। ‘অবসেশন’ সেই পুরোনো কাঠামোকে নতুন রূপ দিয়েছে। ভয়ের আবহ, জাম্প স্কেয়ার ও ডার্ক হিউমারকে নিখুঁতভাবে মিশিয়ে ছবিটি তৈরি করেছে এক সতেজ অভিজ্ঞতা। হরর সিনেমার জগতে তো সেই ইচ্ছাপূরণ প্রায় কখনোই ভালো পরিণতি ডেকে আনে না। নির্মাতা ক্যারি বার্কার ‘অবসেশন’-এ সেই চিরচেনা সত্যকেই নতুনভাবে তুলে ধরেছেন। চলতি বছর মুক্তির পর মাত্র ১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১২ কোটি টাকা) বাজেটের সিনেমাটি বক্স অফিসে আয় করেছে ৩৭৭ মিলিয়ন (প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা) ডলারের বেশি!
ক্যারি বার্কারের চমকে দেওয়া স্বাধীন ঘরানার সিনেমাটি কোন মন্ত্রবলে বুঁদ করল সারা দুনিয়ার দর্শকদের? ক্যারি বার্কার আদতে ইউটিউবার। স্বল্প বাজেটের হরর ছবি ‘মিল্ক অ্যান্ড সিরিয়াল’ দিয়ে তিনি প্রথম নজরে আসেন। ‘অবসেশন’ আবারও প্রমাণ করল, নতুন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নির্মাতাদের জন্য হরর ঘরানাই এখন সবচেয়ে কার্যকর মঞ্চ।
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বিয়ার (মাইকেল জনস্টন) এক বাদ্যযন্ত্রের দোকানের অগোছালো কর্মচারী। স্বভাবে অন্তর্মুখী। সহকর্মী নিকিকে (ইন্দে নাভারেটে) পছন্দ করে বেয়ার। গভীর ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেটি প্রকাশ করার সাহস নেই। সে জানে, মনের কথা বলে ফেললে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে; অস্বস্তিতে পরতে পারে তাদের কমন বন্ধু ইয়ান (কুপার টমলিনসন) ও সারা (মেগান ললেস)। তবু প্রেম তো যুক্তির ধার ধারে না। গল্পটা চিরপরিচিত সেই একতরফা প্রেমের, যার যন্ত্রণার কথা কে না জানে! মজার বিষয় হলো, সারা নিজেও গোপনে বিয়ারকে ভালোবাসে।
একদিন নিকির হারিয়ে যাওয়া একটি নেকলেসের বদলে উপহার কিনতে গিয়ে সে একটি অভিনব জিনিসের সন্ধান পায় বিয়ার। সেটির নাম ‘ওয়ান উইশ উইলো’—একটি কাঠির মতো বস্তু, যেটি মাঝখান থেকে ভেঙে একটি ইচ্ছা প্রকাশ করলে সেই ইচ্ছা নাকি পূরণ হবে! দামও সস্তা, মোটে ৬ ডলার ৯৯ সেন্ট। বিয়ার প্রথমে সেটি নিকিকে উপহার দেওয়ার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত নিজেই ব্যবহার করে ফেলে। এরপর যা ঘটে, সেটি গল্পের বড় চমক নয়। সে ইচ্ছা করে, নিকি যেন পৃথিবীর যেকোনো মানুষের চেয়ে তাকে বেশি ভালোবাসে। আর আশ্চর্যজনকভাবে সেই ইচ্ছাই সত্যি হয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই নিকির ব্যক্তিত্ব বদলে যায়। প্রথম দিকে নিকির এই তুমুল প্রেম উপভোগ করে। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, এই সম্পর্কেরও এক ভয়ংকর অন্ধকার দিক আছে। সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। সাধারণ প্রেমের সম্পর্কের পরিচিত সমস্যাগুলোকে প্রথমে হাস্যরসাত্মক, পরে ভয়ংকর চরম পর্যায়ে নিয়ে যায় এটি।
‘অবসেশন’ বিয়ারকে একেবারে নির্দোষ ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করে না; বরং সে নিজেও এই বিপর্যয়ের অংশীদার। কারণ সে জানে, নিকির এই ভালোবাসা স্বাভাবিক নয়। তবু প্রথম দিকে সেটি উপভোগ করতেই থাকে। পরে যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আর ফেরার পথ থাকে না। চরিত্রটিকে অতিরিক্ত আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেননি; বরং প্রয়োজনীয় জায়গায় বিয়ারকে দুর্বল, করুণ ও অসহায় হিসেবেই তুলে ধরেছেন।
তবে ছবির আসল প্রাণ নিকি তথা ইন্দে নাভারেটে; জাদুর প্রভাবে বদলে যাওয়া নিকি চরিত্রে তিনি এমন এক অসাধারণ অভিনয় করেছেন, যা দীর্ঘদিন মনে থাকবে। তার তীব্র উপস্থিতি যেমন ভয় ধরিয়ে দেয়, তেমনি যখন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিকি আবার নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং কিছুই বুঝতে না পেরে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে, তখন তার জন্য গভীর সহানুভূতিও তৈরি হয়।
ছবিতে চমকে দেওয়ার মতো মুহূর্তেরও অভাব নেই। বিশেষ করে একটি আকস্মিক ওভয়াবহ সহিংস আক্রমণের দৃশ্য এতটাই অপ্রত্যাশিত যে দর্শক সত্যিই হতভম্ব হয়ে যায়। তবে বার্কারের সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি শুধু চমকের ওপর নির্ভর করেন না। ধীরে ধীরে উত্তেজনা তৈরি করেন, সময় নিয়ে ভয়কে জমতে দেন। রক বারওয়েলের আবহসংগীত এতে যোগ্য সংগত দেয়। যদিও কোথাও কোথাও সেই ধীরগতি একটু বেশিই দীর্ঘ মনে হয়। প্রায় ১১০ মিনিটের ছবিটি আরও কিছুটা সংক্ষিপ্ত হলে হয়তো আরও টান টান হতে পারত।
অবশ্য শুধু অপরাধীরাই এই ছবিতে শাস্তি পায় না। যারা কোনো দোষই করেনি, তাদেরও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়। চরিত্র ও দর্শক—উভয়ের প্রতিই মানসিক নিষ্ঠুরতা দেখানোর ক্ষেত্রে বার্কারের মধ্যে স্পষ্টভাবেই আরি অ্যাস্টারের প্রভাব দেখা যায়।
ছবিজুড়ে রয়েছে ভয়ংকর সব দৃশ্য। বিশেষ করে যাঁরা বিড়াল ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য সতর্কবার্তা—এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যা দেখে সিনেমা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের পোষা প্রাণীর খোঁজ নিতে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করবে। রয়েছে হঠাৎই এসে পড়া নির্মম পিটিয়ে হত্যার দৃশ্যও, যার নৃশংসতা এতটাই বেশি ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রে এনসি-১৭ রেটিং এড়াতে সেটির কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে। সব দিক থেকেই ‘অবসেশন’ বিশৃঙ্খল, যেন রক্ত আর অস্বস্তির অনুভূতি চারদিকে ছিটিয়ে দিতে নির্মাতার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।
পুরো ছবিতে বার্কারের আগ্রহ প্রচলিত ভুতুড়ে বাড়ির ভয় তৈরিতে নয়; বরং তিনি সম্পাদনার এমন এক ছন্দ ব্যবহার করেছেন, যা নিজেই দর্শকের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে যথেষ্ট। এর পেছনে রয়েছে তাঁর ইউটিউবার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। ‘ব্যাকরুমস’-এর পরিচালক কেইন পারসন্সের মতো তিনিও নিজের সিনেমার সম্পাদনা নিজেই করেন। পাশাপাশি স্কেচ কমেডিয়ান হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও ছবির গঠনে প্রভাব ফেলেছে। ফলে জাম্প স্কেয়ার তুলনামূলক কম থাকলেও, গল্প যত এগোয়, সংলাপ ও পরিস্থিতির কৌতুক ততই নিষ্ঠুর, অন্ধকার ও মহাজাগতিক মাত্রা পায়।
তবে ‘অবসেশন’-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, নিকির ওপর ভর করার সময় তার প্রতি চালানো যৌন ও মানসিক সহিংসতার বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসন্ধান করতে না পারা। গল্পটি এমন এক পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে, যে নিকিকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয়, বরং জিতে নেওয়ার মতো একটি পুরস্কার হিসেবে দেখে। ফলে ছবিটিও অনিচ্ছাকৃতভাবে নিকির দুর্ভোগকে আড়ালে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সংলাপনির্ভর এবং মূলত সাধারণ ঘরোয়া পরিবেশে আবদ্ধ ‘অবসেশন’-এর গল্প শুরু হয় একতরফা প্রেমকে কেন্দ্র করে। পরে জাদুর ছোঁয়ায় সেটি পরিণত হয় এক দুঃস্বপ্নের মতো আঁকড়ে ধরা সম্পর্কে। শুরুতে ছবিটি যেন অদ্ভুত এক রোমান্টিক কমেডি-আধুনিক যুগের সম্পর্কের মনস্তত্ত্বকে নিখুঁতভাবে ধরতে সক্ষম। কিন্তু একসময় গল্প হঠাৎই স্ল্যাশার হররের পথে মোড় নেয়।
আর সেই মোড়টিও বার্কার এমন দক্ষতায় সামলেছেন যে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। এই সিনেমা সারা দুনিয়ার হররপ্রেমীরা কেন এত পছন্দ করেছেন, সেটা সহজেই বোঝা যায়।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ






























Recent Comments