ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। প্রতিবেদনে মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে ফ্যাক্টরি ওভারহেড কম দেখিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেন তারা। কোম্পানিটির লোন বাড়লেও সুদ বা ইন্টারেস্টের পরিমাণ কম দেখিয়েছে, যেনো মুনাফা বেশি দেখাতে পারে। কোম্পানিটির এমন আচরণে রীতিমতো হতাশা প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাই কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে তালিকাভুক্তির পর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির ব্যবসায়িক পারফর্মেন্স ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু ২০২১ সালে কোম্পানিটির ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ডিভিডেন্ডে।
(কুইন সাউথ টেক্সটাইলের অনিয়ম নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালে কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস বিনিয়োগকারীদের ২০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয়। এরমধ্যে ১০ শতাংশ ক্যাশ এবং ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ। এরপর থেকে কোম্পানিটি আর কাঙ্খিত লভ্যাংশ প্রদান করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের নামমাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে।
কোম্পানিটির এমন পারফর্মেন্সে হতাশা ও ক্ষোভ ঝেড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) টার্নওভার বা বিক্রয় রাজস্ব বেড়েছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। কিন্তু বাস্তবতা হলো টাকার মান কমে যাওয়ায় মূলত বিক্রয় রাজস্ব বেড়েছে বলে স্বীকার করেছেন কোম্পানিটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কুইন সাউথ টেক্সটাইলের বিক্রয় রাজস্ব হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৫৯ লাখ ৬৩ হাজার ৩৬২ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩২৩ কোটি ৮০ লাখ ৩৮ হাজার ৪২৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিক্রয় রাজস্ব বেড়েছে ৬৪ কোটি ৭৯ লাখ ২৪ হাজার ৯৩৬ টাকা বা ২০ শতাংশ। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট প্রফিট বা মুনাফা হয়েছে ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৬২ হাজার ৬১৩ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে দশমিক ৩৬ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে ইপিএস হয়েছিল দশমিক ২৩ টাকা। বছরের ব্যবধানে ইপিএস বেড়েছে দশমিক ১৩ টাকা বা ৫৭ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ফ্যাক্টরি ওভারহেড এসে দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ৪১ লাখ ২১ হাজার ৮৭৪ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭০ কোটি ১২ লাখ ৯১ হাজার ৭৮৩ টাকা। বছরের ব্যবধানে ফ্যাক্টরি ওভারহেড কমেছে ৮ কোটি ৭১ লাখ ৬৯ হাজার ৯০৫ টাকা। আর চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে গ্যাস চার্জ এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৭৬ লাখ ২৪ হাজার ৫৮৮ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২২ কোটি ৯৬ লাখ ১৭ হাজার ২৩০ টাকা। বছরের ব্যবধানে গ্যাস চার্জ কমেছে ৭ কোটি ১৯ লাথ ৯২ হাজার ৬৪২ টাকা বা ৩১ শতাংশ।
সাধারণত কোনো কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও সামগ্রিকভাবে ফ্যাক্টরি ওভারহেড বাড়ে। কুইন সাউথের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। ফ্যাক্টরি ওভারহেড কমেছে, কমেছে এর ভিতরে থাকা গ্যাস চার্জও। মূলত মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যেই গ্যাস চার্জের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ফ্যাক্টরি ওভারহেড কম দেখিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শর্ট টার্ম লোন এসে দাঁড়িয়েছে ১৪৬ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৭ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১২৮ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার ৩১৪ টাকা। বছরের ব্যবধানে শর্টটার্ম লোন বেড়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৩ টাকা।

তথ্য বিশ্লষণ থেকে আরও জানা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শর্টটার্ম লোনের বিপরীতে কোম্পানিটি ব্যাংককে ইন্টারেস্ট বা সুদ দিয়েছে ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৫ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৫ কোটি ৩৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৭ টাকা। বছরের ব্যবধানে ইন্টারেস্ট কমেছে এক কোটি ৯৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৩২ টাকা।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কোম্পানিটির শর্টটার্ম লোন বাড়লেও ইন্টারেস্ট বাড়েনি বরং কমে যাওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন। মূলত গ্যাস চার্জের মতো ইন্টারেস্ট কম দেখিয়েছে মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে এমনটা জানান বাজার সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির ট্রেড অ্যান্ড আদার রিসিভেবলস (গ্রাহকের কাছে পাওনা টাকা) এসে দাঁড়িয়েছে ২৭০ কোটি ৫২ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২০৫ কোটি ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩৫ টাকা। বছরের ব্যবধানে ট্রেড অ্যান্ড আদার রিসিভেবলস বেড়েছে ৬৫ কোটি ১০ লাখ ৪ হাজার ২৭২ টাকা। তৃতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি প্রকৃত সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) এসে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৯৯ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৫ দশমিক ৬৪ টাকা। অর্থাৎ এনএভি বেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, মোট সম্পদ বা টোটাল অ্যাসেট বাড়িয়ে দেখানোর জন্যই মূলত ট্রেড অ্যান্ড রিসিভেবলস বাড়িয়েছে কোম্পানিটি। কারণ টোটাল অ্যাসেট বাড়লে কোম্পানির এনএভ বেড়ে যায়। আর এনএভি বাড়লে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিকে নিয়ে ভালো কিছু ভাবতে শুরু করে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা আরও অভিযোগ করে বলেন, প্রকৃত অর্থে কোম্পানিটির মুনাফা বাড়েছে কিনা তা সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত। যেহেতু কোম্পানিটির শেয়ার দর তলানিতে এসে ঠেকেছে অর্থাৎ এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৪০ টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারটির প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই যদি মুনাফা বেশি দেখানো হয়ে থাকে তাহলে দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারসাজিকারকরা কারসাজি করে শেয়ারটির দর বাড়িয়ে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে মার্কেট থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে পারে।
এ বিষয়ে কুইন সাউথ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. মাসুম রানা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ফ্যাক্টরিতে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে, যেকারণে গ্যাসের ব্যবহার কমেছে। ফলে গ্যাস চার্জ কম হয়েছে। আর গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে সোফর (SOFR) ইন্টারেস্ট রেট কমেছে, যে-কারণে ইন্টারেস্টের পরিমাণ কম এসেছে।
তাঁর এই মন্তব্যের জবাবে এই প্রতিবেদক বলেন, আপনারা যে সোলার প্যানেল বসিয়েছেন সেটিতো আর্থিক প্রতিবেদনের কোথাও উল্লেখ নেই। আর সোফর ইন্টারেস্ট রেট কত কমেছে যে আপনাদের লোনের পরিমাণ বাড়ার পরেও ইন্টারেস্ট এতো কমলো? প্রশ্ন করা হলে কোম্পানি সচিব কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুবালী ব্যাংকের একজন ঊধ্বতন কর্মকর্তা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ২০২৪ সালের মার্চে সোফর ইন্টারেস্ট রেট ছিল ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। আর ২০২৫ এর জুনে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ সামান্য কমেছে। কিন্তু সে তুলনায় ইন্টারেস্টের পরিমাণ অনেক কম দেখিয়েছে কোম্পানিটি। মূলত মুনাফা বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে এমনটি করতে পারে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, কুইন সাউথের বর্তমান যে অবস্থা তাতে বিনিয়োগকারীদের আগামীতে ডিভিডেন্ড দিতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। বিএসইসির উচিত কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের সকলকেই জবাবদীহিতার আওতায় নিয়ে আসা। তাহলেই কোম্পানির আসল চিত্র ফুটে উঠবে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, যে-সমস্ত কোম্পানি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে অনীরিক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রফিট বা মুনাফা বেশি বা কম দেখায় অথবা সন্দেহজনক কিছু করে, সে-সমস্ত কোম্পানিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষমতা এক্সচেঞ্জের যেমন রয়েছে, তেমনি কমিশনেরও রয়েছে। কমিশন বা স্টক এক্সচেঞ্জের উচিত সঠিক তদন্ত করে এসমস্ত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ করা।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments