নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ ও রসায়ন খাতের অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি (এসিআই) লোকসান থেকে বের হতেই পারছে না। গত কয়েক বছর ধরে লোকসান করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়াও চরম অর্থ সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) ঋণ বেড়ছে ২১ শতাংশ। এমন বাস্তবতায় কোম্পানিটির প্রতি দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এসিআই। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানটি গত পাঁচ বছরের মধ্যে তিন বছর ধরেই লোকসান বাড়া-কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে কোম্পানিটি ব্যবসায়িকভাবে তলানিতে চলে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কোম্পানিটির নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ।
(এসিআই-এর অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৩ সালে এসিআইয়ের লোকসান হয়েছে ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৩ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসনা হয়েছে ৬ দশমিক ৪৮ টাকা। ২০২৪ সালে লোকসান হয়েছে ১২৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৮০৯ টাকা এবং শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৮ দশমিক ২৫ টাকা। আর সর্বশেষ সদ্য বিদায়ী বছরে (২০২৫) শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭ দশমিক ৪০ টাকা।
এদিকে লোকসানে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী বছরে নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো পার শেয়ার (এনওসিএফপিএস) ঋণাত্বক হয়েছে ৫১ দশমিক ৬৩ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ৫১ দশমিক ৬৩ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছে, যা কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত হতাশার বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
তারা এও বলেন, কোম্পানিটি ঋণের করাল গ্রাসে এক সময় মুখ থুবড়ে পড়বে। কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কোম্পানি খুব শিগগিরই দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে এসিআই’র সদ্য বিদায়ী বছরের সম্পূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন এখনো ডিএসই ও কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত না হওয়ায় সর্বশেষ তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) থেকে জানা গেছে, কোম্পানির ট্রেড ও আদারসহ মোট রিসিভেবল হয়েছে ২ হাজার ৩৭১ কোটি ৯১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। ট্রেড ও আদার রিসিভেবল হচ্ছে- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তির কাছে কোম্পানির পাওনা টাকা। বিশাল অঙ্কের এই পাওনা টাকা কোম্পানি আদৌ আদায় করতে পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই টাকা কোম্পানির মুনাফায় যোগ হয়েছে। অর্থাৎ এই পাওনা টাকা বাদ দিলে কোম্পানির লোকসান আরও বেড়ে যেতো।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেন, অনেক কোম্পানি মুনাফা বেশি অথবা কোম্পানির গ্রোথ ভালো দেখানোর উদ্দেশ্যে ট্রেড রিসিভেবল বেশি দেখিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে লোকসান কম দেখানোর উদ্দেশ্যে এসিআই রিসিভেবল বেশি দেখিয়ে থাকতে পারে বলে জানান তারা।

তৃতীয় প্রান্তিকে থেকে আরও জানা গেছে, কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনার জন্য লোন ও ধার নিয়েছে ৫ হাজার ৮৩২ কোটি ৩৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। আর গত ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরে যা ছিল ৪ হাজার ৮০২ কোটি ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। নয় মাসে প্রতিষ্ঠানটির ধার ও লোন বেড়েছে এক হাজার ৩০ কোটি ৩০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
এদিকে এসব ব্যাপারে জানতে এসিআই’র কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উদ দৌলাকে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদেরকে ম্যাসেজ পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এসিআই এর ব্যবসা খুবই ভালো। কিন্তু কোম্পানিটির ম্যানেজমেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদ দুর্নীতিগ্রস্ত, যেকারণে প্রফিট বা মুনাফা হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে লোকসান দেখায়, যাতে করে ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) কম দিতে হয়। আমাদের চাপে এবার ২৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড (নগদ লভ্যাংশ) দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারীদের সাথে ছলচাতুরি করে আসছে। কোম্পানিটির ব্যাপারে অধিকতর তদন্ত হওয়া বলে আমরা মনে করি।
উল্লেখ্য, এসিআইয়ের পরিশোধিত মূলধন ৮৭ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৯ দশমিক ৮০ শতাংশ, উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৪৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৩৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments