ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: সিগারেটের দাম ও কর বাড়ানোর পরও সরকারের প্রত্যাশিত রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে না। চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য রাজস্ব ঘাটতি ৩ হাজার কোটি টাকা। দাম বৃদ্ধির পরও ঘাটতির কারণ কি তা খতিয়ে দেখা উচিত।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ‘মিডিয়া ওয়ার্কশপ অন টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি : লেসন্স ফ্রম ২০২৬-২৭ বাজেট, মার্কেট ট্রেন্ডস, পলিসি আউটকামস অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। একই সঙ্গে তামাক করনীতিতে মূল্যস্ফীতি, বাজারের পরিবর্তন, ভোক্তার আচরণ এবং সরকারের রাজস্ব প্রয়োজনীয়তা আরও কার্যকরভাবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত কর্মশালায় সাংবাদিক, গবেষক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
কর্মশালায় পিপিআরসির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মোহাম্মদ ইহতেশাম হাসান তামাক কর কাঠামো, বাজারের প্রবণতা, রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব তুলে ধরেন।
গবেষণাপত্রে পিপিআরসি বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সিগারেটের চার স্তরের মূল্য কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট কর চালু করা হয়নি। নিম্নস্তরের সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রথমে ৬২ টাকা এবং পরে ৬৫ টাকা করা হয়েছে। মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৯২, ১৬০ ও ২১০ টাকা।
তবে পিপিআরসির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত অধিকাংশ স্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য কমেছে। অর্থাৎ নাম মাত্র দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় সিগারেটের প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ায় তামাকজাত পণ্যের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বর্তমান এড ভ্যালোরিম কর কাঠামোর অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো খুচরা মূল্য বাড়লেও সরকারের রাজস্ব একই হারে বাড়ে না। এ কারণে কর কাঠামোয় নির্দিষ্ট আবগারি কর যুক্ত করা হলে কর বৃদ্ধি থেকে সরকারের রাজস্ব আরও পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারে। কর্মশালায় সিগারেটের বাজারে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের তথ্যও তুলে ধরা হয়।
পিপিআরসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে মোট সিগারেট বাজারে নিম্নস্তরের সিগারেটের হিস্যা ছিল ৭৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের মে নাগাদ তা ৪৯ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিপরীতে একই সময়ে মধ্যম স্তরের সিগারেটের হিস্যা ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্য পুনর্নির্ধারণের পর কিছু ব্র্যান্ডের শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে বাজারের এ পরিবর্তনের একটি অংশ ঘটেছে। তবে একই সঙ্গে ভোক্তাদের তুলনামূলক বেশি দামের সিগারেটের দিকে যাওয়ার প্রবণতাও এতে প্রতিফলিত হতে পারে।
তবে টানা দুই বছর সিগারেটের সরবরাহ কমলেও তামাক কর থেকে রাজস্ব বেড়েছে। পিপিআরসি সতর্ক করে বলেছে, শুধু সরবরাহের তথ্য দিয়ে ধূমপানের হার বা প্রকৃত সিগারেট ভোগের পরিবর্তন নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য চাহিদা ও ধূমপানের প্রবণতা নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
কর্মশালায় ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট সময়ে সিগারেট থেকে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা কমে যাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পিপিআরসি বলেছে, এই ঘাটতিকে এখনই সিগারেট খাতে স্থায়ী বা কাঠামোগত রাজস্ব ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারণ নতুন ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থা রাজস্ব হিসাব ও আদায়ের সময়কে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে সিগারেট থেকে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আদায় হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার ৭৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে আসে প্রায় ৪ হাজার ৭৩৩ কোটি ৮০ লাখ টাকায়। পিপিআরসির একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বলা হয়, ভ্যাট হিসাবের সময়গত প্রভাব সর্বোচ্চ মাত্রায় ধরা হলে আপাত রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকায় নেমে আসতে পারে। তবে এটি প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ভ্যাট পরবর্তী সময়ে আদায় হয়েছে বা হবে—তার কোনো পূর্বাভাস নয়। প্রকৃত চিত্র জানতে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের পৃথক ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের তথ্য প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পিপিআরসি।ফরেক্স ট্রেডিং দেখুন
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সিগারেটের ব্যবহার কমাতে হলে মূল্য ও করের মাধ্যমে তামাকজাত পণ্যকে আরও কম সাশ্রয়ী করতে হবে।
বাংলাদেশে সিগারেটের দাম এখনো তুলনামূলক কম উল্লেখ করে সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যম স্তরের সিগারেটের বাজার হিস্যা দ্রুত বাড়ার বিষয়টি ভোক্তাদের আচরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। শক্তিশালী কর ব্যবস্থা সিগারেটের ক্রয়ক্ষমতা কমাতে এবং ধূমপায়ীদের ব্যবহার কমানো বা ছাড়তে উৎসাহিত করতে পারে।
কর্মশালায় তামাক বাজারের নজরদারি জোরদার, নিয়মিত বিক্রি ও করসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করা এবং সরকারি নির্ধারিত খুচরা মূল্য ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের পার্থক্য খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে প্রচলিত একক শলাকা বা খোলা সিগারেট বিক্রির প্রভাবও পর্যালোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়। পিপিআরসির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মোট রাজস্ব আদায়ে সিগারেট কর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গত এক দশকে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ১০ থেকে ১৩ শতাংশ এসেছে সিগারেট থেকে। ফলে তামাক করনীতি সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব কৌশলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির পরিচালক (এইচআর অ্যান্ড বাজেট) সৈয়দ জিয়াউদ্দিন আহমেদ আইন বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/অ
































Recent Comments