ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকেই অর্থ লুট, ভ্যাট ফাঁকিসহ নানা বিতর্কে জড়িয়েছে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি। এবার প্রতিষ্ঠানটির সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই,২৪-মার্চ,২৫) অনীরিক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল ধরা পড়েছে। কোম্পানিটির এমন অনৈতিককান্ডে রীতিমত হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
তারা অভিযোগ করে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জুনায়েদ শফিকের স্বৈরশাসকের দোসর হিসাবে পরিচিতি এবং বিত্তবৈভবের বিস্তৃতি ঘটে গত এক দশকে। চিকিৎসক পেশা ছাপিয়ে বনে যান আর্থিক খাতের মাফিয়াদের একজন। বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পুঁজিবাজার থেকে ২০২২ সালে ৭৫ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। গত বছরের (২০২৪) মার্চে ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য কোম্পানিটি বন্ড ইস্যু করে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে পুঁজিবাজার ও ব্যাংক থেকে মোট ৫৫০ কোটি টাকা নিয়েছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস। এসব অর্থ তিনি প্রতিষ্ঠানের কাজে না লাগিয়ে বিদেশে পাচার এবং ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে রীতিমত গোজামিল দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, যা হতবাক করেছে সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার সংশ্লিষ্টদের।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ব্যাংক লোন ও লিজ লায়াবিলিটিজ বাবদ ব্যয় প্রায় দুই কোটি টাকা কমলেও এর বিপরীতে সুদ বেড়েছে আকাশ ছোয়া ২২ কোটি টাকার বেশি। যেখানে সুদ কমার কথা, সেখানে না কমে বরং বেড়েছে। ধামাচাপা দিয়ে কোম্পানিটি অনীরিক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ব্যাংক ও লিজের সুদ বাবদ বিদায়ী বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির খরচ হয়েছে ৫৩ কোটি ৪২ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৫ টাকা। এর আগের অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্যাংক ও লিজের সুদ বাবদ খরচ হয়েছিল ৩০ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার ৯৫৪ টাকা। বছরের ব্যবধানে ব্যাংক ও লিজের সুদ বাবদ নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যয় বেড়েছে ২২ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬১ টাকা।

বিদায়ী বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির ব্যাংক লোন ও লিজ লায়াবিলিটিজ ছিল ৪৮৬ কোটি ১৭ লাথ ২১ হাজার ৮৪৪ টাকা। এর আগের অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে যা ছিল ৪৮৭ কোটি ৯০ লাখ ৩ হাজার ৬০৭ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যাংক লোন ও লিজ লায়াবিলিটিজ কমেছে এক কোটি ৭২ লাখ ৮১ হাজার ৭৬৩ টাকা।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতে, আইপিও’র সময় নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস কাগজে কলমে স্বচ্ছতা দেখিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে কোম্পানিটি স্বচ্ছ ছিল না। ম্যানেজমেন্ট থেকে শুর করে পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে ছিল স্বচ্ছতার অভাব। যার কারণে তালিকাভুক্তির পর থেকেই নানা রকম বিতর্কে জড়িয়েছে কোম্পানিটি। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক শিবলী কমিশনের ছত্রছায়ায় কোম্পানিটি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানেও আর্থিক প্রতিবেদনে গোজামিল দিয়ে বাজার থেকে অর্থ লোপাটের চেষ্টা করছে কোম্পানিটি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজারকে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস বিতর্কিত একটি কোম্পানি। আমরা সকলেই তা জানি। কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে গোজামিল দেবে এটাই স্বাভাবিক। তালিকাভুক্তির সময়েও গোজামিল দিয়েছে। বর্তমান কমিশনের এখনই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
আরও পড়ুন: নাভানা ফার্মার সন্দেহজনক বিনিয়োগ: ২০ কোটি হয়ে গেল ৩ কোটি টাকা
এ বিষয়ে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের কোম্পানি সচিব লরেন শ্যামল মল্লিক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, এখন অফিস বন্ধ। আগামী সোমবার (৭ জুলাই) অফিস খুললে বলতে পারবো।
উল্লেখ্য, এর আগেও একটি নিউজের ব্যাপারে লরেন শ্যামল মল্লিকের কাছে জবাব চাওয়া হয়। তিনি অফিসে গিয়ে দেবেন বলে জানান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অফিসে গেলেও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে তথ্য গোপন, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ধাবাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্ব প্রতিবেদন আকারে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে তুলে ধরা হবে। আজ তুলে ধরা হলো দ্বিতীয় পর্ব।
চলবে……………
































Recent Comments