
ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো Frontier মার্কেটে রয়েছে৷ পক্ষান্তরে, সামাজিক ও অন্যান্য খাতে আমাদের থেকে পিছিয়ে থাকা দেশও Frontier অতিক্রম করে ইমার্জিং মার্কেট-এ রূপান্তরিত হয়েছে৷ যা আমাদের জন্য সুখকর নয় বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মোঃ ইউনুসুর রহমান।
২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিঃ এর অনুষ্ঠিত ৬০তম বার্ষিক সাধারণ সভা তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডিএসই’র চেয়ারম্যান আরো বলেন, বিগত ২০২০ সাল বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বছর ছিল৷ করোনা মহামারীর সংক্রমনের পূর্ব হতেই আমদানী, রপ্তানী, বেসরকারী বিনিয়োগ ও রাজস্ব সংগ্রহের মত কতগুলো সূচক বিবেচনায় অর্থনীতি কিছুটা চাপের মুখে ছিল৷ তাছাড়া উচ্চ খেলাপী ঋণের চাপে ব্যাংকিং খাত কিছুটা নাজুক পরিস্থিতিতে ছিল৷ অতঃপর করোনা মহামারীর কারণে অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশের অর্থনীতি অধিকতর চাপের মুখে পড়ে৷ শিল্পখাতের প্রায় পুরোটাই কোভিড-১৯ দ্বারা প্রভাবিত হয়৷ কিছু ক্ষেত্রে কোভিডের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল৷ দেশীয় ও বৈশ্বিক সকল ক্ষেত্রে চাহিদা কমে যায়, জীবন ও জীবিকা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে৷ এ সময়ে কৃষি খাত হয়ে উঠেছিল একমাত্র ভরসার স্থল৷ যেহেতু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের অর্থনীতি বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে অধিক মাত্রায় সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে, সেহেতু কোভিডের কারণে স্থবির হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির সাথে সাথে বাংলাদেশের রপ্তানী আয়, অভিবাসীদের বিদেশ গমন এবং বৈদেশিক বিনিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়৷ তবে আশার কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি ও মানানসই মুদ্রানীতি পরিচালনার মাধ্যমে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ভালভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সম্ভব হয়৷ এর ফলে মহামারীর নেতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও কৃষিক্ষেত্রের অত্যাধিক ভাল ফলন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে৷ তাছাড়া, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি এবং অর্থ বছরের শেষ দিকের রপ্তানীর উর্ধ্বমুখী প্রবণতার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷ আবার এ রূপ পরিস্থিতিতে মুদ্রাস্ফীতির হারও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে৷
ডিএসই’র চেয়ারম্যান আরো বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে একটি ছোট বাজার৷ কোভিড-১৯ এর আতঙ্ক শুরু হওয়ার পর সকল অংশীজনদের আপ্রাণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারের পতন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করে৷ পরবর্তীতে সরকারের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বে আসা নতুন কমিশনের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের প্রচেষ্টায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হয় এবং পুঁজিবাজারে ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি হয়৷ এতে পুঁজিবাজার বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। এর ফলে বিবেচ্য বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ও লেনদেনের পরিমান উভয়ক্ষেত্রে বর্ধনশীল অবস্থা লক্ষ করা যায়৷
পুঁজিবাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসার বিষয়ে ২০২০-২১ সালের বাজেটে সরকারের স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রস্তাবনা এবং সুশাসন নিশ্চিকরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ এবং পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য৷ তাছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাজার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্টেকহোল্ডারগনের যথাযথ ভূমিকা পালনের কারণে এ সকল ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে বলে আমি বিশ্বাস করি৷
কোভিড-১৯ মহামারীর মাধ্যমে চরম বাধাগ্রস্থ হওয়া সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ অন সাইট ও ভার্চ্যুয়াল কার্যক্রমের মাধ্যমে এক্সচেঞ্জের সকল কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে গেছেন৷ এ বছরে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপ হলো-
* ডিএসই “ডিজিটাল সাবমিশন এন্ড ডেসিমিনেশন প্লাটফর্ম” নামক একটি সফ্টওয়্যার চালু করেছে-যার সাহায্যে বিভিন্ন কোম্পানি সিকিউরিটিজ নিয়ম মেনে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ করতে পারবে এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স এর মাধ্যমে পরিপালিত হবে৷
* ডিএসই বিএসইসি এর উদ্যোগে আইপিও প্রক্রিয়া সহজীকরনের উদ্দেশ্যে ইলেক্ট্রনিক সাবসক্রিপসন সিস্টেমের মাধ্যমে আইপিও সাবসক্রিপসন এবং আনুপাতিক হারে শেয়ার বণ্টনের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করেছে৷ ডিএসই এই ইলেক্ট্রনিক সাবসক্রিপসন সিস্টেম এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমানে অর্থ আয় করছে৷ নতুন আইপিও পদ্ধতিতে ট্রেকহোল্ডাররাও আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন৷
* অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টার এবং ডিআর সাইট তৈরি করার কাজ চলছে৷
* ১.৫ মিলিয়ন লেনদেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার জন্য সার্ভারের সাথে আরো র্যাক যুক্ত করে বিদ্যমান ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে৷
* ৫৪টি নতুন ট্রেক প্রদান করা হয়েছে৷
* ট্রেকহোল্ডারদের এপিআই প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে৷
* ট্রেডিং প্লাটফর্মকে আরো সুবিধাজনক করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে৷
* ডিএসই’র অনলাইন রিস্ক বেইজড ক্যাপিটাল অ্যাডেকোয়েসি (আরবিসিএ) রিপোর্টিং
সফ্টওয়্যার চালু করা হয়েছে৷
এছাড়াও বাজার উন্নয়ন কার্যক্রম তথা ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য অতি সম্প্রতি বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানিজ এর চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সম্ভাবনা ও সুযোগ শীর্ষক সম্মেলন করা হয়৷ এ ধরনের কার্যক্রম আগামীতে অব্যাহত থাকবে৷
বিগত ৫৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের অনেকগুলো মূল্যবান পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা ছিল৷ ডিএসই বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সকল বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে৷ কিছু কিছু বিষয়ে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে৷ এর মধ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ হতে এসএমই প্লাটফর্ম চালু হয়েছে৷ অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড লেনদেনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, নতুন পণ্য হিসেবে একটি গ্রীণ সুকুক বন্ড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে৷ ইতোমধ্যে ৩৬টি ব্রোকার হাউজ এপিআই নেয়ার জন্য আবেদন করেছে৷ ৪টি কোম্পানি নিজস্ব অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছে৷ এদের মধ্যে ২টি কোম্পানি সার্টিফিকেশন পেয়েছে৷ আশা করা যায় শীঘ্রই ৪টি কোম্পানি Go-Live এ যাবে৷ তাছাড়া ডিএসই’র আয়ের খাতে বৈচিত্র আনার লক্ষ্যে ডাটা বিক্রির আয় বাড়াতে ইতিমধ্যে SCL Advisory Limited নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে৷
ডিএসই টাওয়ার প্রসংগে তিনি বলেন, ডিএসই টাওয়ার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অন্যতম একটি ফাইনান্সিয়াল হাবে পরিণত হয়েছে৷ ভবনের কিছু স্পেস শেয়ারমার্কেট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নতুন ট্রেক হোল্ডারদের জন্য রাখা রয়েছে৷
কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের পুঁজিবাজার যতটুকু এগিয়েছে তা প্রসংশনীয়৷ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং বিশেষ করে সামাজিক খাত সেভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার এখনো তার সাথে তালে তাল মিলাতে পারছেনা৷ বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো Frontier মার্কেটে রয়েছে৷ পক্ষান্তরে, সামাজিক ও অন্যান্য খাতে আমাদের থেকে পিছিয়ে থাকা দেশও Frontier অতিক্রম করে ইমার্জিং মার্কেট-এ রূপান্তরিত হয়েছে৷ যা আমাদের জন্য সুখকর নয়৷ সরকার, রেগুলেটর, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অচিরেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ইমার্জিং মার্কেট-এ প্রবেশ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন৷
উল্লেখ্য, শেয়ারহোল্ডারদের উপস্থিতিতে বার্ষিক সাধারণ সভায় ২০২১ সালের ৩০ শে জুন তারিখে সমাপ্ত অর্থবছরের ডিএসই’র পরিচালনা পষদের প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষিত হিসাবসহ নিরীক্ষকের প্রতিবেদন গ্রহণ, বিবেচনা ও অনুমোদন সর্বসম্মতিভাবে অনুমোদিত হয়। এছাড়াও ৩০ জুন ২০২১ তারিখে সমাপ্ত অর্থবছর পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশকৃত ৪ (চার) শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় এবং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য নিরীক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের পারিতোষিক নির্ধারণ করা হয়। এছাড়াও ২৬ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে ডিএসই’র পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক নির্বাচনে শরীফ আনোয়ার হোসেনকে পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে ৬০তম বার্ষিক সাধারণ সভায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ডিএসই’র পরিচালক হিসেবে পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷
সভায় বক্তব্য রাখেন বুলবুল সিকিউরিটিজ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এস শাহুদুল হক বুলবুল, প্রাইলিঙ্ক সিকিউরিটিজ লিঃ এর চেয়ারম্যান ডাঃ মোঃ জহিরুল ইসলাম, গ্রীনল্যান্ড ইকুইটিজ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. রাজিব আহসান, শ্যামল ইকু্ইটি ম্যানেজমেন্ট লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সাজেদুল ইসলাম, মডার্ন সিকিউরিটিজ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুজিস্তা নূর-ই-নাহরীন, গ্লোবাল সিকিউরিটিজ লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও, আলী সিকিউরিটিজ কোং লিঃ এর চেয়ারম্যান এম. আকবর আলী৷
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/নি.
































Recent Comments