ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাতিলসহ পুুঁজিবাজার উন্নয়নে ১৬ দফা দাবি পেশ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
আজ ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ.কে. এম. মিজান-উর রশিদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কাজী আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ২০১০ইং থেকে পুঁজিবাজারে যে মহাধ্বস শুরু হয়েছিল তা ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আপনার কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও কমিশনের সঠিক নেতৃত্বে পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পূর্বের কমিশনের মেয়াদ কালে (২০১১-২০২০ইং) সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছে, অনেকে আত্মহত্যা করছে। অনেকে হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। পূঁজিবাজারের এই ভয়াবহ অবস্থার জন্য পূর্বের কমিশনের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম সহ ইস্যুকৃত শেয়ার ও দুর্বল কোম্পানীগুলোর ওচঙ অনুমোদনই সবচেয়ে বেশী দায়ী। অতিরিক্ত প্রিমিয়াম সহ ইস্যুকৃত অধিকাংশ কোম্পানীর শেয়ারদের তার ইস্যু মূল্যের নীচে চলে এসেছিল। কোন কোন শেয়ারের দর ১ টাকা থেকে ৩ টাকার মধ্যে অবস্থান করেছিল। ওচঙ শেয়ারে বেশী প্রিমিয়াম দেওয়ার দুর্নাম থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে বি.এস.ইসি পাবলিক ইস্যু রুলস ২০১৫ প্রণয়ন ও সংশোধন করে। এই প্রক্রিয়ায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে একমি ল্যাবরেটরিজ, আমরা নেটওয়ার্কস, আমান কটন, বসুন্ধরা পেপার মিলস, এস্কয়ার নিট কম্পোজিট, রানার অটো-মোবাইলস, এডিএন টেলিকম কোম্পানীগুলো পূঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। সর্বশেষ ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ তালিকাভূক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কাটঅফ প্রাইজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিডিং প্রক্রিয়ায় প্রতিটি কোম্পানীতে ইতিপূর্বে যথেষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। এখানে ইস্যু ম্যানেজারগণ মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। প্রতিটি কোম্পানীর বিডিং প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজারের সহায়তায় কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় দূর্নীতিবাজ ইলিজ্যেবল ইনভেস্টররা পরস্পরের যোগসাজসের মাধ্যমে শেয়ারের উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে। বিএসইসি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সংশোধনী আনলেও এই অনিয়ম ও দূর্নীতি রোধ করতে পারেনি। শেয়ার দর অতিমূল্যায়িত হওয়ায় কোম্পানীগুলো লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লক্ষ লক্ষ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানীগুলোর কাট অফ প্রাইজ ও শেয়ারের সর্ব নিম্ন বাজার মূল্য নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
১ একমি ল্যাবরেটরিজ ৮৫ টাকা ৫৪.২০ টাকা
২ আমরা নেটওয়ার্কস ৩৯ টাকা ২৮.৩০ টাকা
৩ আমান কটন ফাইবার লি: ৪০ টাকা ১৬.০০ টাকা
৪ বসুন্ধরা পেপার ৮০ টাকা ৩৫.০০ টাকা
৫ এস্কয়ার নিট কম্পোজিট ৪৫ টাকা ১৮.৩০ টাকা
৬ রানার অটোমোবাইলস ৭৫ টাকা ৩৯.০০ টাকা
৭ এডিএন টেলিকম ৩০ টাকা ২৬.৮০ টাকা
এই কোম্পানীগুলোর মধ্যে আমরা নেটওয়ার্কস, আমান কটন, বসুন্ধরা পেপার, এস্কয়ার নিটকম্পোজিট এবং রানার অটোমোবাইলস কোম্পানীগুলোর বিডিং প্রক্রিয়ায় পরস্পর যোগ-সাজস, কারসাজি, দূর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে বিডিং বাতিলের জন্য পূর্বের বিএসইসি এর চেয়ারম্যান বরাবর আমরা দরখাস্ত দিয়েছিলাম, কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বরং এইসব কোম্পানীগুলোর কারণে পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরী হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সর্বশেষ ওয়াল্টন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লি: কোম্পানীটি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এখানে কতিপয় দূর্নীতিবাজ যোগ্য বিনিয়োগকারীরা অনিয়ম, কারসাজি ও দূর্নীতির মাধ্যমে পরস্পরের যোগ সাজসে কোম্পানীটিকে উচ্চমূল্য পাইয়ে দিয়েছে এবং কোম্পানীটির কাট অফ প্রাইজ ৩১৫ টাকা নির্ধারিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, কোম্পানীটির সর্বোচ্চ বিডিং হয়েছিল ৭৬৫ টাকায়।
আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বুক বিল্ডিং পদ্ধতির দূর্বলতার কারণে কোম্পানী কর্তৃপক্ষ, ইস্যু ম্যানেজার ও কতিপয় দুর্নীতিবাজ যোগ্য বিনিয়োগকারীরা পরস্পর যোগ সাজসের মাধ্যমে কোম্পানীগুলোর শেয়ার দর অতি মূল্যায়িত করে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্থ করেছে। বিএসইসি যেটা কোনভাবেই বোধ করতে পারছে না।
১৬ দফা দাবি হলোঃ
১. পূঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার বৃহত্তর স্বার্থে অতিদ্রুত “বাইব্যাক আইন” পাস করতে হবে। এক্ষেত্রে কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদকে ইস্যু মূল্যে অথবা ঘঅঠ এর ৫% কম এই ২টির মধ্যে যেটি বেশি হবে সেই মূল্যে শেয়ার বাইব্যাক করতে হবে।
২. মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদেয় ঐতিহাসিক যুগান্তকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাজারের পতন রোধকল্পে ‘ফ্লোর প্রাইজ’ পদ্ধতি বহাল রাখতে হবে এবং দশ টাকার নিচে বা ফেস ভ্যালুর নিচের প্রত্যেকটি শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস ভ্যালু ন্যূনতম দশ টাকায় নির্ধারণ করতে হবে।
৩. মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক নির্দেশিত কোম্পানী আইনের ২ঈঈ ধারা মোতাবেক শেয়ার বাজারের লিস্টেড প্রতিটি কোম্পানীর পরিচালকগণকে সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০% শেয়ার ধারণ করতে হবে এবং এককভাবে পরিচালকগণকে ২% শেয়ার ধারণ করতে হবে। যদি কোন কোম্পানী ও পরিচালকগণ উক্ত পরিমাণ শেয়ার ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. স্বল্পমূলধনী ও দুর্বল কোম্পানীকে ওচঙ অনুমোদন দেওয়া যাবে না। ঐ সমস্ত কোম্পানী পূঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হবে তাদের চধরফ টঢ় ঈধঢ়রঃধষ কম পক্ষে ২শ কোটি টাকা হতে হবে।
৫. রাইট শেয়ার ইস্যু বন্ধ রাখতে হবে। তবে যেসকল কোম্পানী পরপর কমপক্ষে ০৭ বৎসর ১০% হারে ক্যাশ ডিবিডেন্ট দিয়েছে/দিবে তাদের ক্ষেত্রে রাইট শেয়ার ইস্যুর বিষয়টি বিবেচনা করা যাবে।
৬. চষধপবসবহঃ শেয়ারের টাকা কোম্পানীগুলোর চধরফ টঢ় ঈধঢ়রঃধষ হিসাবে দেখানো যাবে না। কোম্পানীগুলোর প্রতারণার অন্যতম কারণ হলো অবৈধ চষধপবসবহঃ বাণিজ্য।
৭. বাজারের তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধি করার জন্য বিদ্যমান মার্জিন লোন প্রদানের হার ১ : ০.৫% থেকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম ১:১.৫ করার দাবি করছি (অর্থাৎ বর্তমানে ১ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৫০ পয়সা পর্যন্ত লোন সুবিধা বিদ্যমান কিন্তু তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য এটিকে ১ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ১ টাকা ৫০ পয়সা/দেড় টাকা পর্যন্ত লোন সুবিধা প্রদান করতে হবে)। মার্জিন লোনের সুদ বার্ষিক শতকরা ১০ টাকা করতে হবে।
৮. সরকার ঘোষিত সকল ব্যাংকগুলোকে শেয়ার বাজারে দুইশো (২০০) কোটি টাকা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধি করে ন্যূনতম পাঁচশো (৫০০) কোটি টাকা পর্যন্ত উন্নীত করতে হবে এবং বাজারের আস্থা সৃষ্টি ও তারল্য সংকট দ্রুত দূর করার জন্য উক্ত বিনিয়োগ সমূহ বাধ্যতামূলকভাবে সর্বোচ্চ আগামী ডিসেম্বর ২০২০ইং এর মধ্যে বিনিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে।
৯. সকল ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, ইস্যু ম্যানেজারদেরকে শুধুমাত্র শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের শর্তে প্রচলিত এফডিআর এর ন্যায় স্বল্প সুদে এফডিআর, এসটিআর, এলটিআর অথবা নিজস্ব মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অনুমতি প্রদান করতে হবে।
১০. আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, শেয়ার বাজার এবং ব্যাংকের মানদন্ডের সাথে তাল মিলিয়ে এদেশীয় সরকারি-বেসরকারি খাতকে আরও অধিকতর শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য বাস্তবতার আলোকে সময় উপযোগী ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট সৃষ্টি করতে হবে। যাতে ব্যাংক গুলো দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ দিতে গিয়ে খেলাপি না হয়ে যায়, আবার ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম সময়ে বিভিন্ন কোম্পানি ও উদ্যোক্তারা যাতে বন্ড মার্কেট থেকে টাকা তুলে দেশীয় উন্নতি, কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি পাত করতে হবে।
১১. যেসকল অডিটর, ইস্যু ম্যানেজার, আন্ডার রাইটার, এ্যাসেট ভ্যালুয়েশন কোম্পানী, স্পন্সশর মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদেরকে বিভ্রান্ত করে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ লুটপাট করেছে তাদেরকে ৩ (তিন) বৎসরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
১২. ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং এ্যাক্ট অতি দ্রুত চালু করতে হবে, ওটিসি মার্কেট বন্ধ করে সেখানকার কোম্পানী সমূহকে প্রয়োজনে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও মূল বাজারে ফিরিয়ে আনতে হবে বা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বিক্রি করে শেয়ারের সংখ্যা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দিতে হবে, পাশাপাশি জেড ক্যাটাগরি পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে।
১৩. বাজারে বর্তমানে লিস্টেড সাইত্রিশ (৩৭) টি মিউচুয়াল ফান্ডের ভূমিকা ক্ষতিয়ে দেখতে হবে। কারণ প্রচার আছে যে, মিউচুয়াল ফান্ড গুলো বাজার থেকে টাকা উত্তোলন করে সেই টাকা শেয়ার বাজারে যথাযথ সময়ে, যথাযথভাবে বিনিয়োগ না করে তারা নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন বেনামি ব্যবসা এমনকি ব্যাংকেও এফডিআর করে বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। তাই তাদের ফান্ড গুলোকে কঠোর তদারকির আওতায় এনে সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে সমুদয় টাকা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বাধ্য করতে হবে।
১৪. সিডিবিএল, ডিএসই, সিএসই কে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। শতভাগ ডিজিটাল, অনলাইন ও আধুনিক সেবার আওতায় তাদেরকে দ্রুত নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে অদূর ভবিষ্যতে যে কোন দূর্যোগ/দূর্ঘটনা/প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ পূঁজিবাজার শতভাগ ঈড়হভরফবহঃ ধহফ ঃৎধহংঢ়ধৎবহঃষু চলমান থাকতে পারে। কোনো ভাবেই বৈশি^ক পূঁজিবাজার থেকে আমাদের পূঁজিবাজারকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না।
১৫. পূঁজিবাজারের প্রধানতম প্রাণশক্তি সেকেন্ডারি মার্কেটকে আরও গতিশীল, প্রাণবন্ত, লাভজনক, নিরাপদ করার জন্র শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। যাতে করে দূর্নীতিবাজও লুটপাট কারীরা ভবিষ্যতে পূঁজিবাজারকে ক্ষতিগ্রস্থ করতে না পারে।
১৬. আন্তর্জাতিক মানদন্ড অর্জন ও বাজারের পরিধি ব্যাপকহারে বৃদ্ধির জন্য শেয়ারবাজারে আরও অধিক হারে বন্ড ইস্যু, মিউচুয়্যাল ফান্ড ইস্যু, পেনশন ফান্ডে বিনিয়োগ উৎসাহিত করন, প্রফেশনাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অনুমতি প্রদানের দাবি করছি।
অতএব এমতাবস্থায়, আমাদের প্রিয় পূজিবাজারের সোনালী অতীতের হারানো গৌরব, সুনাম, বিশ^াস যোগ্যতা, স্থিতিশীলতা এবং আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ও শক্তিশালী অর্থনীতি ও বিশ^মানের পূঁজিবাজার তৈরি করার জন্য আমাদের উপরোক্ত যৌক্তিক দাবী সমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের বিনীত অনুরোধ করছি।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম এইচ


































Recent Comments