ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির মুনাফা কমলেও চীফ এক্সিকিউটিভ-পরিচালকদের ক্ষেত্রে পোয়াবারো। ব্যাংকটির ‘নো’ ডিভিডেন্ড ঘোষণা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছু না পেলেও চীফ এক্সিকিউটিভের বেতন-ফিস বেড়েছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা। আর প্রায় ২১ লাখ টাকা ফিস বেড়েছে পরিচালকদের। ব্যাংকটির এরকম দ্বৈতনীতির কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের (ক্লাসিফায়েড লোন) পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যার কারণে এই ঋণের বিপরীতে কোম্পানিটির প্রভিশনিংও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আর প্রভিশনিং বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিটি ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের কোনো ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) দিতে পারেনি।
সূত্রটি জানায়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া ও ডিভিডেন্ড না দেওয়ায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে, যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির শেয়ার দরে। কোম্পানিটি থেকে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ উঠিয়ে নেয়ায় শেয়ার দর ফেসভ্যালুর (অভিহিত মূল্য) নিচে অবস্থান করছে।
সূত্রটি আরও জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ভালো ব্যবসা করতে না পারায় গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালে সর্বনিম্ন মুনাফা করেছে। এমন নিম্নমুখী ব্যবসার মধ্যেই কোম্পানিটি ৩য় সাব-অর্ডিনেটেড বন্ড ইস্যু করে ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আলোচিত বন্ডটির মেয়াদ শেষে এর পূর্ণ অবসায়ন ঘটবে। বন্ডটি শেয়ারে রূপান্তর-অযোগ্য। অর্থাৎ এর কোনো অংশ শেয়ারে রূপান্তর হবে না। এই বন্ডের বিপরীতে কোনো জামানত থাকবে না। এর সুদের হার হবে ভাসমান। বন্ডটি হবে কুপনযুক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন সাপেক্ষে বন্ড ইস্যু করার এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন প্রয়াত মো. আব্দুল জলিল, যিনি মৃত্যুর আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। যার কারণে গত ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের সুনজরে ছিল ব্যাংকটির উপর। ফলে বিভিন্ন দিক দিয়ে নানারকম সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পরেই ব্যাংকটির আসল চিত্র ফুটে উঠে।
তারা আরও জানান, ইতিমধ্যে ব্যাংকটির ব্যবসা কমতে শুরু করে। ঋণ খেলাপি বেড়ে যায়। বর্তমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে ব্যাংকটির। এ অবস্থায় যদি ব্যাংকটি উল্লেখিত বন্ড ছেড়ে ৮০০ কোটি টাকা উত্তোলন করে, তবে সেই বন্ডের সুদ ও আসল টাকা আদৌ পরিশোধ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৪ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৭৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর আগের বছরে যা ছিল এক হাজার ৭৩১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। বছরর ব্যবধানে ঋণ খেলাপি বেড়েছে ৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বা ১৯৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি মোট লোন দিয়েছে ৩০ হাজার ২ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। ২০২৩ সালে মোট লোন দিয়েছে ২৮ হাজার ৪৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। বছরের ব্যবধানে এক্ষেত্রে লোনের পরিমাণ বেড়েছে এক হাজার ৫১৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখা হয়েছে ৫৪৪ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫২৯ টাকা। যার কারণে মুনাফায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নিট প্রফিট এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৪ কোটি ৯৫ লাখ ৬৭ হাজার ১৩১ টাকা। আর শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ০ দশমিক ৫৮ টাকা। এতো অল্প প্রফিট করায় ‘নো’ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে কোম্পানিটি।
সাধারণত খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের উপরে গেলেই যে-কোনো ব্যাংকের জন্য বিপদজনক। সেক্ষেত্রে আগামী দিনগুলোতে ব্যাংকটিতে আমানতকারীদের (ডিপজিটর) রাখা আমানত নিরাপদে থাকবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তীক্ষ্ণ নজর রাখা উচিত বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড না দিতে পারলেও চীফ এক্সিকিউটিভ ও পরিচালকদের দু হাত খুলে সম্মানি দিয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক। ২০২৪ সালে চীফ এক্সিকিউটিভকে বেতন এবং ফিস বাবদ দেওয়া হয়েছে এক কোটি ৭৯ লাখ ২ হাজার ২৩২ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল এক কোটি ৬০ লাখ ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা। বছরের ব্যবধানে চীফ এক্সিকিউটিভের বেতন ও ফিস বেড়েছে ১৮ লাথ ৮৬ হাজার ৫১৭ টাকা। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির পরিচালকদের ফিস ছিল ৬৮ লাখ ৪ হাজার ৬০০ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৪৭ লাখ ৮ হাজার টাকা। বছরের ব্যবধানে তাদের ফিস বেড়েছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র অসীম কুমার শাহা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। যে-কারণে আমাদের ঋণ খেলাপী বেড়েছে। এর বিপরীতে প্রভিশনিং বেড়ে যাওয়ায় আমাদের প্রফিট কম হয়েছে। ফলে আমরা বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারিনি।
তিনি বলেন, অনেকেই আমাদের কাছ থেকে লোন নিয়েছেন। কিন্তু সে-সমস্ত লোন, সুদ পরিশোধ করছেন না। যারা ফলে ব্যাংকের ব্যবসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের। ব্যাংকের নিজের লোকজনই এসমস্ত ঋণ নিয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচার করেছে। যার কারণে ঋণ খেলাপিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ব্যাংকটি ‘নো’ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। শুধু তাই নয়, কোম্পানিটির শেয়ার দরও ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। আর শেয়ার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উল্লেখ্য, কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ১১০ কোটি ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৫টি, যার মধ্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে ০ দশমিক ৭২ শতাংশ। আজ (২৩ জুলাই) কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ৮ দশমিক ৮০ টাকা।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের অনিয়ম নিয়ে আজ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ
































Recent Comments