নিজস্ব প্রতিবেদক: বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেই মূলত বছর শেষে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেই ডিভিডেন্ড যদি না পান তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন তারা। গুটি কয়েক কোম্পানি ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা ভঙ্গ করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো পুঁজিবাজারে। পুঁজিবাজার হয়েছে অস্থিতিশীল ও নিম্নমুখি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রটি জানায়, প্রতিশ্রুতি দিয়েও সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরকে ডিভিডেন্ড না দেওয়ার তালিকায় এবার উঠে এসেছে পুঁজিবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মের প্রকৌশল খাতের মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নাম। ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরের জন্য ৪ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড (নগদ লভ্যাংশ) ঘোষণা করেও তা বিতরণ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে বলির পাঠা হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে পূর্বের ঘোষিত ডিভিডেন্ড বিতরণ না করলেও সদ্য বিদায়ী বছরের জন্য নতুন করে আবারও ডিভিডেন্ড নাটক সাজিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নামমাত্র ২ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। মোস্তফা মেটালের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
এদিকে, ডিভিডেন্ড বিতরণ না করলেও পরিচালকদের সম্মানী ভাতা ঠিকই বাড়িয়েছে মোস্তফা মেটাল। ফলে এমন দ্বৈতনীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
(মোস্তফা মেটালে ইন্ডাস্ট্রিজের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ প্রকাশ করা হলো দ্বিতীয় পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে তৃতীয় পর্ব।)
জানা গেছে, ২০২১ সালের শেষের দিকে বিনিয়োগকারীদের কাছে নানারকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুঁজিবাজারের এসএমই প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তি হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। ৪ বছর যেতে না যেতেই সেসমস্ত প্রতিশ্রুতি গুড়েবালিতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ৩০ জুন ২০২৪ হিসাব বছরের ঘোষিত ডিভিডেন্ড না দিতে পারলেও সদ্য বিদায়ী হিসাব বছরের (৩০ জুন ২০২৫) জন্য আবারও ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও নামমাত্র ২ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ঘোষিত ডিভিডেন্ড প্রদান না করে মোস্তফা মেটাল আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। কোম্পানিটির ব্যবসার যে দুর্বল অবস্থা, তা যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে, ঘোষিত ২ শতাংশ ডিভিডেন্ডও বিনিয়োগকারীদেরকে দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, ২০২৪ সাল ঘোষিত ডিভিডেন্ড না দিতে পারলেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের সম্মানি ভাতা বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে কোম্পানিটির পরিচালকদের সম্মানি ভাতা ছিল ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ২৫৭ টাকা। আর ২০২৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তাদের সম্মানি ভাতা বেড়েছে সাত লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩ টাকা।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, ৩০ জুন ২০২৫ হিসাব বছরে মোস্তফা মেটালের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৫ পয়সা। এর আগের বছর যা ছিল এক টাকা ২০ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৭৫ পয়সা বা ৬২ শতাংশ।
মোস্তফা মেটালের কোম্পানি সচিব মো. নাজমুল ইসলাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, কোম্পানির অবস্থা খুবই খারাপ। আমাদের প্রতিযোগী অনেক বড় বড় কোম্পানি। আমরা তাদের সাথে ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছি না। আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ভালো নেই। যেকারণে ঘোষিত ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি কোম্পানি।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, মোস্তফা মেটাল ফান্ডামেন্টাল (মৌলভিত্তি) কোম্পানি না। সাউন্ট কোম্পানি না। এই কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসছেই মূলত ছলচাতুরি করার জন্য, বিনিয়োগকারীদের পকেট খালি করার জন্য।
তিনি ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আগামীতে কোম্পানিটির অস্তিত্ব টিকে থাকবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। কমিশনের (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) উচিত কোম্পানিটির ব্যাপারে তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমরা কমিশনের এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্টে মোস্তফা মেটালের বিরুদ্ধে একশন (পদক্ষেপ) নিতে নাম পাঠিয়েছি। তারা ইতিমধ্যে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে কাজ করছে।
কোম্পানিটির সদ্য বিদায়ী বছরের ডিভিডেন্ড ঘোষণা সম্পর্কে তিনি বলেন, নতুন করে যে ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে তা বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) আগে আলাদা ব্যাংক হিসাব নাম্বারে জমা রাখতে হবে এবং তা এজিএমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সামনে সে সংক্রান্ত কাগজপত্র উপস্থাপন করতে হবে। তারা কাগজপত্র উপস্থাপন করতে না পারলে বা ডিভিডেন্ড না দিলে কঠিন থেকে কঠিনতর পদক্ষেপ নেওয়া হবে মোস্তফা মেটালের বিরুদ্ধে।
উল্লেখ্য, মোস্তফা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের অনুমোদিত মূলধন ৪৮ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যার মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৫৫ দশমিক ০৬ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments