সোমবার, ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

spot_img
spot_img
Homeঅন্যান্যযে নবী আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমরা কি কখনও তার জন্য কেঁদেছি?
spot_img
spot_img

যে নবী আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমরা কি কখনও তার জন্য কেঁদেছি?

ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে। তার বিচ্ছেদে কাঁদে, তার স্মৃতিতে হৃদয় ভিজে যায়। ইতিহাসে এমন একজন মহামানব আছেন, যিনি তাঁর উম্মতকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তারা পৃথিবীতে আসার আগেই তাদের জন্য কেঁদেছেন, তাদের জন্য দোয়া করেছেন, তাদের মুক্তির জন্য রাত জেগে আল্লাহর দরবারে মিনতি করেছেন। তিনি আমাদের প্রিয় নবী, হযরত মুহাম্মাদ (সা.)।

আজ আমরা নিজেদেরকে একটি প্রশ্ন করি— ‘যে নবী আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমাদের জন্য দোয়া করেছেন,আমাদেরকে না দেখেও ভালোবেসেছেন, আমরা তাকে কতটুকু ভালোবাসি? তার জন্য শেষ কবে আমাদের চোখে অশ্রু ঝরেছে?’

সীরাতে ইবনে হিশাম পড়ে একবার কেঁদেছিলাম। আংটি পড়ে যাওয়ার অজুহাতে একজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কবরের মধ্যে দ্বিতীয়বার নেমেছিলেন। এ ছিল তার প্রিয় নবীর কাছ থেকে শেষ বিদায় নেওয়ার এক হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। সেই ঘটনা পড়ে বুকটা হাহাকার করে উঠেছিল।

একদিন হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে অত্যন্ত প্রফুল্ল দেখে তিনি বললেন— ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।’

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করলেন—

‘হে আল্লাহ! আয়েশাকে ক্ষমা করে দিন। তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দিন, তার ভবিষ্যতের গুনাহ ক্ষমা করে দিন, তার গোপন গুনাহ ক্ষমা করে দিন এবং প্রকাশ্য গুনাহও ক্ষমা করে দিন।’

এই দোয়া শুনে হজরত আয়েশা (রা.) আনন্দে হাসতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন— ‘আমার এই দোয়া কি তোমাকে আনন্দিত করেছে?’

তিনি বললেন— ‘এমন দোয়ায় সন্তুষ্ট হবে না, এমন মানুষ কি আছে?’

তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার উম্মতের জন্য প্রত্যেক নামাজে এই দোয়াই করি।’ যে দোয়া তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য করেছিলেন, সেই একই দোয়া তিনি তার উম্মতের জন্য করতেন—আপনার জন্য, আমার জন্য। তিনি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)।

একদিন পথ চলতে চলতে রাসুলুল্লাহ (সা.) কেঁদে উঠলেন। সাহাবায়ে কেরাম কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন— ‘আমি আমার ভাইদের জন্য কাঁদছি।’

সাহাবারা বললেন— ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমরা কি আপনার ভাই নই?’

তিনি বললেন— ‘তোমরা তো আমার সাহাবী। আমার ভাই হলো তারা, যারা আমার পরে আসবে এবং আমাকে না দেখেই আমার প্রতি ঈমান আনবে।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমাদের জন্য অপেক্ষা করেছেন, আমাদেরকে ভালোবেসেছেন—আমরা পৃথিবীতে আসারও আগে। কিন্তু আমরা তাকে কতটুকু স্মরণ করি? কতবার ভালোবেসে তার নামে দরুদ পাঠ করি? কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে তার সুন্নাহকে জীবনের অংশ বানাই?

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমদিকে একটি খেজুর গাছে হেলান দিয়ে খুতবা দিতেন। পরে যখন মিম্বর তৈরি হলো এবং তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতে শুরু করলেন, তখন সাহাবাগণ সেই গাছের ভেতর থেকে শিশুর মতো কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। প্রিয় নবীর বিচ্ছেদে একটি গাছও কেঁদেছিল। যে গাছ তার জন্য কেঁদেছে, আমরা কি তার জন্য কেঁদেছি?

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত বিলাল (রা.) আর আজান দিতে পারতেন না। তার কণ্ঠে বারবার নবীর স্মৃতি ফিরে আসত। অবশেষে তিনি মদিনা ছেড়ে চলে যান।

বহু বছর পর একদিন তিনি মদিনায় ফিরে এলেন। সবাই তাকে আজান দেওয়ার অনুরোধ করল। তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ, যে আজান তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য দিয়েছেন, তা আর কারও জন্য দিতে মন সায় দিচ্ছিল না। অবশেষে সাহাবায়ে কেরামের অনুরোধে তিনি আজান দিতে দাঁড়ালেন।

‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…’ সেই কণ্ঠ, সেই সুর, সেই স্মৃতি—সবকিছু যেন মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল নবুয়তের যুগে। মদিনার মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে এলো। কারও মনে হলো, বুঝি আবার রাসুলুল্লাহ (সা.) ফিরে এসেছেন। কিন্তু যখন তিনি ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ’ উচ্চারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তখন পুরো মদিনা কান্নায় প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

কুরআনের আলোকে নবীর প্রতি ভালোবাসা

আল্লাহ তাআলা বলেন—

النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ

‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের থেকেও অধিক আপন।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৬)

لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ

‘নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের কষ্ট তার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ও দয়ালু।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ১২৮)

হাদিসের আলোকে নবীপ্রেম

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি ১৫, মুসলিম ৪৪)

যে নবী (সা.) আমাদের জন্য দোয়া করেছেন, আমাদের জন্য অশ্রু ঝরিয়েছেন, আমাদের মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে কেঁদেছেন— তার প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই ভালোবাসার প্রমাণ হতে হবে দরুদে, সুন্নাহর অনুসরণে, তার আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করার মাধ্যমে।

আজই নিজের হৃদয়কে একটি প্রশ্ন করি—

> শেষ কবে আমরা প্রিয় নবী (সা.)-এর কথা ভেবে কেঁদেছি?

> শেষ কবে তার নামে ভালোবেসে দরুদ পাঠ করেছি?

> শেষ কবে তার একটি সুন্নাহ নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি?

যে নবী আমাদের না দেখেই ভালোবেসেছেন, তার প্রতি আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো— তার আনুগত্য করা, তার সুন্নাহকে জীবনের অলংকার বানানো এবং তার ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করা।

اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَىٰ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ ﷺ

ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম

RELATED ARTICLES
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

Most Popular

Recent Comments