নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের ইফাদ অটোস পিএলসির ব্যবসায়িক দৈন্যদশায় হতাশ সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে খাত সংশ্লিষ্টরা। বলতে গেলে ব্যবসায়িক মন্দায় খাদের কিনারে চলে গেছে কোম্পানিটি। এই অবস্থা থেকে কোম্পানিটি আদৌ নিজেকে উত্তরণ ঘটাতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে, জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তারা জানান, গত তিন বছর ধরে ইফাদ অটোস ব্যবসায়িকভাবে ভালো অবস্থায় নেই। কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণছে কোম্পানিটি। গত দুই বছর বিনিয়োগকারীদের নামমাত্র ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) দিয়েছে। অর্থাৎ ইফাদ অটোস গত দুই বছর যে ডিভিডেন্ড দিয়েছে তা দেওয়া না দেওয়া প্রায় সমান কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, প্যারেন্টস কোম্পানি ইফাদ অটোস মুনাফা করতে না পারলেও তার সহযোগি প্রতিষ্ঠান ঠিকই মুনাফা করছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন ও সন্দেহ জেগেছে, সত্যিই কি ইফাদ অটোস লোকসান করছে? নাকি বিনিয়োগকারীদেরকে ডিভিডেন্ড না দেওয়ার অযুহাতে ও প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে লোকসান দেখাচ্ছে। সেটি অবশ্য তদন্ত হলেই সঠিক চিত্র ফুটে উঠবে এবং খুব শিগগিরই কোম্পানিটির সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত করা উচিত বলে মনে করেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
(ইফাদ অটোস লিমিটেডের অনিয়ম নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ প্রকাশ করা হলো প্রথম পর্ব। খুব শিগগিরই প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।)
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছর ধরে লোকসানের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারছে না ইফাদ অটোস। ২০২৩ সালে লোকসান হয়েছে ১৫ কোটি ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪২ টাকা, ২০২৪ সালে হয়েছে ১৬ কোটি ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং ২০২৫ সালে লোকসান করেছে ৭ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ৪২৪ টাকা। আর শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে যথাক্রমে ০ দশমিক ৫৮ টাকা, ০ দশমিক ৬২ টাকা এবং ০ দশমিক ২৭ টাকা।

সূত্রটি বলছে, জুন ক্লোজিংয়ের কোম্পানিটি ২০২৪ সালে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিয়েছে মাত্র দুই শতাংশ, যার মধ্যে এক শতাংশ ক্যাশ ও এক শতাংশ স্টক বা বোনাস শেয়ার। আর ২০২৫ সালে মাত্র দুই শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে বাঁচতেই কোম্পানিটি মূলত এই নামমাত্র ডিভিডেন্ড প্রদান ও ঘোষণা করেছে বলে জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০২৪ সালে সহযোগি কোম্পানি ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টস লিমিটেড থেকে ইফাদ অটোস প্রফিট বা মুনাফা পেয়েছিল ৬ কোটি ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৮১ টাকা। আর ২০২৫ সালে মুনাফা পেয়েছে ৪ কোটি ২ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৫ টাকা।
জানা গেছে, সহযোগি প্রতিষ্ঠান ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টস লিমিটেডের এই মুনাফা বিনিয়োগকারীদের মনে সন্দেহ আরও বারিয়ে দিয়েছে। তারা বলছেন, সহযোগি প্রতিষ্ঠান যদি মুনাফা ধরে রাখতে পারে তাহলে প্যারেন্ট কোম্পানি ইফাদ অটোস কেন মুনাফা ধরে রাখতে পারছে না? এতে নিশ্চয় কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে। কমিশনের শিগগিরই এব্যাপারে খতিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে ‘সমৃদ্ধির পথে এক সাথে’ স্লোগান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইফাদ অটোস কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু কোম্পানিটি নিজেই তার স্লোগান ধরে রাখতে পারছে না। সমৃদ্ধির পথে তার সহযোগি কোম্পানি এগিয়ে গেলেও ইফাদ অটোস নিজে সমৃদ্ধ হচ্ছে না। দিনকে দিন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদেরকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ইফাদ অটোস ব্যবসায়িকভাবে এতোটাই ভঙ্গুর অবস্থায় নিমজ্জিত হয়েছে যে, সদ্য বিদায়ী বছরে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সেবিলিটি (সিএসআর) খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে সমাজের পিছিয়ে পড়া অনেক মানুষ সুবিধাবঞ্চিত হয়েছেন।

ইফাদ অটোসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ইফাদ অটোস ও ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টস ভিন্ন ভিন্ন খাতের কোম্পানি। কোভিড-১৯, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ভালো অবস্থায় নেই, যার প্রভাব পড়েছে ইফাদ অটোসে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরুল হক ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, আমরা ইফাদ অটোসকে সম্ভাবনাময় কোম্পানি ভেবেছিলাম। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে ততই তারা বিনিয়োগকারীদের নিরাশ করছে। গত তিন বছর তারা যে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, সেটি সঠিক নয়। তারা নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে লোকসান দেখাচ্ছে। কোম্পানিটির ব্যাপারে তদন্ত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আমি এখনই বলে দিচ্ছি ইফাদ অটোসের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে। অনিয়ম কিছু পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ইফাদ অটোসের পরিশোধিত মূলধন ২৬৮ কোটি ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যেখানে পুঁজিবাজারের বিভিন্ন শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের (উদ্যোক্তা/পরিচালক ব্যতীত) মালিকানা রয়েছে ৪৫ দশমিক ১৩ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments