ডেইলি শেয়ারবাজার ডেস্ক: বিশ্বকাপের সূচি ঘোষিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচ নিয়ে খুব চর্চা হচ্ছিল। আফগানরা যেদিন বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে এলো, সেদিন থেকেই। চট্টগ্রামের সংবাদ সম্মেলনে হাশমতউল্লাহ শাহিদিকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বারুদের মসলা মেশানো উত্তর দিয়েছিলেন। বোঝাতে চেয়েছিলেন, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের চেয়ে তারাও কোনো অংশে কম নন। আফগান অধিনায়ক বিশ্বকাপে বাজিমাত করার প্রচ্ছন্ন একটা হুমকিও দিয়েছিলেন সেদিন। তিন ম্যাচের সিরিজটি তারা ২-১ ব্যবধানে জিতে নেওয়ার পর সবার ভেতরে একটা চাপা আতঙ্ক ঘাপটি মেরে ছিল। এশিয়া কাপে বড় ব্যবধানে জয়ের পরও ধুকপুকানি কাটছিল না।

গতকাল ধর্মশালায় সে শঙ্কাগুলোকে সাকিব আল হাসানরা মাটিচাপা তো দিলেনই, আফগানিস্তানকে উড়িয়ে বিশ্বকাপে শুভসূচনাও করলেন তারা। অর্থাৎ জয়যাত্রায় শুরু বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান এবং তা একপেশে ম্যাচে রূপ দিয়ে জিতে নেওয়া। পরিসংখ্যানটা এমন– আফগানিস্তানকে ৩৭.৪ ওভারে ১৫৬ রানে অলআউট করে, ৩৪.৪ ওভারে ১৫৮ রান তুলে ছয় উইকেটের জয়। সেদিক থেকে বলা যায়, অভাবনীয় জয়ে বিশ্বকাপ শুরু সাকিবদের।
হিমাচলের ধলাধারের নৈসর্গে এই ম্যাচ শুরুর ঘণ্টা দেড়েক আগে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান সমকালকে বলেছিলেন, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি ম্যাচ হবে। বাংলাদেশকে জিততে হলে মিডল অর্ডারে ভালো রান করতে হবে বলেও যুক্তি দেখিয়েছিলেন। যদিও রকিবুল হাসানের ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক হয়নি।
ক্রিকেটাররা বরং বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখতে কল্পনাতীত ভালো ক্রিকেট খেলেন। যে জয়ে অনেক ধাঁধার উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে। বাংলাদেশ যে অনেক দূর যাওয়ার জন্য ভারত বিশ্বকাপ খেলছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জয় ইরেজার হিসেবে কাজ করবে বিতর্ক মুছে দিতে। সত্যি বলতে, সবকিছু চাপা দিতে বিশ্বকাপে ভালো শুরুর ব্যাপারে উন্মুখ ছিলেন অধিনায়ক। হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরুর পর থেকে খুবই আবেগকম্পিত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে অভিব্যক্তি প্রকাশে। আফগানিস্তানের প্রতিটি উইকেট পতনের মুহূর্তে ভেতরের চাপা আবেগ উগড়ে দিচ্ছিলেন সাকিব উত্তেজনার পারদ গলিয়ে।
মেহেদী হাসান মিরাজ যখন প্রতিপক্ষ অধিনায়ক হাশমতউল্লাহর উইকেট পেলেন, তখন সাকিব এমনভাবে শরীর ঝাঁকালেন, যেন জয় থেকে ছোঁয়া দূরত্বে বাংলাদেশ। এরপর থেকে ক্যামেরা নিয়মিতই টাইগার অধিনায়ককে অনুসরণ করতে দেখা গেছে এবং টিভি পর্দায় প্রদর্শিত হয়েছে অন্যরকম অভিব্যক্তি।
ধর্মশালায় খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলই। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ আর অভিজ্ঞতার মিশেলে ‘গেম প্ল্যান’ করেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। রান তাড়া করার পরিকল্পনা থেকে টসে জিতে ফিল্ডিং নেন অধিনায়ক। বোলিংয়ের শুরুটা ঝলমলে হয়নি। শক্তিশালী পেস বোলিং ইউনিট দিয়ে বল করিয়েও ওপেনিং জুটি ভাঙা যায়নি। পাওয়ার প্লেতে ব্যর্থ হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। নিরুত্তাপ সে মুহূর্তকে উত্তেজনার রসদ দেন সাকিব ৮.২ ওভারে ইব্রাহিম জাদরানকে সাজঘরে পাঠিয়ে। ১৬তম ওভারে দ্বিতীয় ব্রেকথ্রুও এ বাঁহাতির বলে। ততক্ষণে ৮৩ রান হয়ে গেছে আফগানদের। যেটা বড় সংগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজ ও মুস্তাফিজুর রহমানের জোড়া আঘাতে বাঁকবদল হতে থাকে। স্পিন-পেসের সমন্বিত আক্রমণে ব্যাটারদের ফেরার মিছিল বড় হতে থাকে। ৭৬ বল বাকি থাকতে অলআউট হয় আফগানিস্তান।
বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ১৫৭ রানের। কন্ডিশন বিবেচনায় খুবই সহজ লক্ষ্য। ধীরে এবং ধরে খেলে গেলে ওপেনিং জুটির হাতে শেষ হতে পারত ম্যাচ। লিটন কুমার দাস ও তানজিদ হাসান তামিমের সে ধৈর্য ছিল না। কেমন আক্রমণাত্মক একটা মেজাজ নিয়ে ব্যাট করতে নেমেছিলেন তারা, যার খেসারতও দিতে হলো। দু’জনই নায়ক হওয়ার সুযোগ হেলায় হারান ৫ ও ১৩ রানে আউট হয়ে। তানজিদের রানআউট কিছুটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে তরুণ এ ওপেনারের আউটের মধ্য দিয়ে একটা বার্তাও পেলেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। অনুশীলন ম্যাচে রান করা আর মূল ম্যাচের চাপ সামলে ভালো করার পার্থক্য অনেক। লিটন-তানজিদের আউটের পর পাওয়ার প্লের বোলারদের মোকাবিলা করতে হয় মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাজমুল হোসেন শান্তকে। তারা দু’জন ৯৭ রানের জুটি গড়েন ১২৯ বলে।
তিন তিনবার জীবন পেয়ে মিরাজ ৫৭ রান করেন ৭৩ বলে। নাজমুল হোসেন শান্ত ম্যাচ শেষ করেন ৮৩ বলে ৫৯ রানে অপরাজিত থেকে। তিনবার জীবন পেলেও অলরাউন্ড পারফরম্যান্স করা মিরাজের হাতেই উঠেছে ম্যাচসেরার পুরস্কার। তাঁর এবং তাদের নৈপুণ্যের ছোঁয়ায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের মতো ২০২৩ বিশ্বকাপেও অপরাজিত থাকার গৌরব ধরে রাখল বাংলাদেশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/এম আর.
































Recent Comments