ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের রানার অটোমোবাইলস পিএলসি’র প্লেসমেন্টধারী শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান হলেও সেকেন্ডারী মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করে শত শত কোটি টাকার লোকসানের কবলে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। শুধু তাই নয়, কোম্পানিতে নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করলে আগামী ২৬৮ বছরেও সেই বিনিয়োগ উঠবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ম্যানেজমেন্টের অস্বচ্ছতা, দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া ও মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে গোপনীয়তার আশ্রয় নেয়ায় রানার অটোমোবাইলসের প্রতি দীর্ঘদিন ধরেই আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।বর্তমানে এই আগ্রহ, আস্থা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কোম্পানিটির শেয়ার দরে। ইস্যু মূল্যের চেয়ে কোম্পানিটির শেয়ার দর বর্তমানে ৬৩ শতাংশ কমেছে, যার ফলে অধিক দামে কোম্পানিটির শেয়ার কিনে বিশাল অঙ্কের লোকসানে পড়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তাদের মতে, মুনাফা বৃদ্ধি ও ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় রানার অটোমোবাইলস পিএলসি। কিন্তু মুনাফা বৃদ্ধিতো হয়েই-নি উপরন্তু লোকসান করেছে। আর ইস্যু মূল্যের চেয়ে গত কয়েক বছরে শেয়ার দর আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। ভালো, মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ভেবে অনেকেই রানার অটোমোবাইলসে বিনিয়োগ করে সর্বশান্ত হয়েছেন। নতুন করে কোম্পানিটির শেয়ারে কেউ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না।
তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ২০১৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় কোম্পানিটির ইস্যু মূল্য ছিল ৬৮ টাকা। আর ৩০ জুন, ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির শেয়ার দর এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকা। এক্ষেত্রে শেয়ার দর কমেছে ৪৩ টাকা।
এদিকে গত ২৯ মে ২০২৫ তারিখে কোম্পানিটির এক লাখ ৩৬ হাজার ২১৬টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। আর ৩০ জুন, ২০২৫ তারিখে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৭৯ হাজার ৬৭৫টি। এক্ষেত্রে প্রতিষ্টানটির শেয়ার লেনদেন কমেছে ৫৬ হাজার ৫৪১টি বা ৪২ শতাংশ।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ কে এম মিজান উর রশীদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বশান্ত হয়েছেন। কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ মৌল ভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল রানার অটোমোবাইলস। কমিশনের উচিত কোম্পানিটির ব্যাপারে সঠিক তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটির প্রাইস আর্নিংস (পিই) রেশিও বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম অনুসারে কোনো কোম্পানির পিই রেশিও সর্বোচ্চ ৪০ পয়েন্ট হলে সেটিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকিমুক্ত বলা হয়। কিন্তু পিই রেশিও ৪০ পয়েন্টের উপরে হলেই সেই কোম্পানিতে বিনিযোগ ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে রানার অটোমোবাইলের পিই রেশিও ২৬৮ পয়েন্ট। অর্থাৎ নিয়ম অনুসারে কোম্পানিটিতে কেউ বিনিযোগ করলে সেই বিনিয়োগ লভ্যাংশ আকারে উঠিয়ে নিতে ২৬৮ বছর সময় লাগবে।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান করেছে রানার অটোমোবাইলস। তৃতীয় প্রান্তিকে (৩১ মার্চ, ২০২৫) কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ৭২ লাখ ৭২ হাজার ৭৭৭ টাকা লোকসান করেছে।
কোম্পানির প্রসপেক্টাস সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটি ভালো ব্যবসা দেখিয়ে পুঁজিবাজারে উচ্চ প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করেছিল। যা দিয়ে আরও বেশি মুনাফা করার ঘোষণা দিয়েছিল রানার অটোমোবাইলস। কিন্তু মুনাফাতো বাড়েই-নি উপরন্তু লোকসান করেছে কোম্পানিটি। আইপিও’র সময় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ৪ দশমিক ৯০ টাকা মুনাফা দেখানো হয়েছিল। আর বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৪) কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি লোকসান করেছে ০.৫৪ টাকা।
এদিকে সম্প্রতি চাইনিজ ইয়াদিয়া ব্র্যান্ডের স্কুটার বাজারে উদ্বোধন করে রানার অটোমোবাইলস। কিন্তু এই স্কুটার বাজারজাত করার ব্যাপারে যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল সেটি প্রাইস সেনসিটিভ ইনফরমেশন (পিএসআই) হিসেবে স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) জানায়নি রানার অটোমোবাইলস। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এব্যাপারে স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসি কি ব্যবস্থা নিয়েছে জানতে চাওয়া হয় সংস্থা দুটির কাছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ডেইলি শেয়াবাজার ডটকমকে বলেন, বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। যদি কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য গোপন করে থাকে তবে রানার অটোমোবাইলসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।
এদিকে এসব ব্যাপারে জানতে কোম্পানিটির সচিব মো. মিজানুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুবির কুমার চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হয়। মিজানুর রহমান কোনো সাড়া দেননি। তবে সুবির কুমারের নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সনাত দত্ত ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, পাবলিক রিলেশন অফিসার ওয়াহিদ মুরাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য। পরবর্তীতে ওয়াহিদ মুরাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অফিসে ডাকেন। কিন্তু অফিসে গেলেও তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
রানার অটোমোবাইলসের তথ্য গোপন, অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র ধাবাবাহিকভাবে কয়েকটি পর্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আকারে ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমে তুলে ধরা হবে। আজ তুলে ধরা হলো দ্বিতীয় পর্ব।
চলবে……………
































Recent Comments