ডেইলি শেয়ারবাজার রিপোর্ট: আমানতের পরিমান কমলেও এক বছরের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকিং খাতের কোম্পানি উত্তরা ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বেতন-ভাতা বেড়েছে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। আর পরিচালকদের ফি বেড়েছে ২৩৭ শতাংশ। কোম্পানিটির এমন আচরণে রীতিমত হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
তারা বলেন, উত্তরা ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ কমেছে। তবে এর বিপরীতে সুদের পরিমাণ বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকটির হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণও কমে গিয়েছে। অথচ এমডি ও পরিচালকদের বেতন ভাতা ঠিকই বাড়িয়েছে কোম্পানিটি। কোম্পানিটির এধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আরও বলেন, উত্তরা ব্যাংক মৌলভিত্তিসম্পন্ন ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু ব্যাংকটির ম্যানেজমেন্টের অদূরদর্শিতা রয়েছে। কোম্পানিটির পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত দুটি ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ রয়েছে। যদিও অনেক আগে কোম্পানি দুটিতে বিনিয়োগ করেছে উত্তরা ব্যাংক। তারপরেও উত্তরা ব্যাংকের উচিত ছিল কোম্পানি দুটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে আসার আগেই বিনিয়োগ উঠিয়ে নেওয়া।
তারা বলেন, ন্যাশনাল টি কোম্পানি ও ইউনিয়ন ব্যাংক মোটেও ভালো মানের কোম্পানি না। বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে ইউনিয়ন ব্যাংক। তারপরেও কেন দীর্ঘদিন ধরে এই দুই প্রতিষ্ঠানে উত্তরা ব্যাংক বিনিয়োগ ধরে রেখেছে, তা আমাদের বোধগম্য না। এখানে ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি–মার্চ,২৫) উত্তরা ব্যাংকে আমানতকারীদের আমানতের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৩০ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার ৫৪২ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২২ হাজার ২৭১ কোটি ৩৯ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৮৪১ কোটি ২৯ লাখ ৪ হাজার ৮২৪ টাকা।

এদিকে, আমানত কমলেও এর বিপরীতে ব্যাংকটি আমানতকারীদের সুদ দিয়েছে ২৪১ কোটি ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮৩২ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৯০ কোটি ৪১ লাখ ৯৯ হাজার ৮২৪ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সুদের পরিমাণ বেড়েছে ৫১ কোটি ১৫ লাখ ৬০ হাজার ৮ টাকা।
তথ্য বিশ্লেষণে আরও জানা গেছে, ব্যাংকটির হাতে থাক নগদ অর্থের পরিমাণ কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নগদ অর্থের পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৪১৭ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৫ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৮১ কোটি ২৫ লাখ ৯ হাজার ১৭৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে নগদ অর্থের পরিমাণ কমে গেছে ১৬৪ কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার ৭০১ টাকা।

এদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ‘জেড’ কোম্পানির শেয়ার ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসিতে উত্তরা ব্যাংকের বিনিয়োগ রয়েছে যথাক্রমে ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫০ টাকা ও ৯ লাখ ৯৭ হাজার ২২৯ টাকা।
কোম্পানি দুটি ‘জেড’ ক্যাটাগরির হওয়ায় তাদের শেয়ার দর কমতে শুরু করেছে। এখনই এই বিনিযোগ উঠিয়ে না নিলে উত্তরা ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বেতন-ভাতা ও ফি বাবদ ৭০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে। এর আগের বছর যা ছিল ৫২ লাখ ৯৬ হাজার ৮২ টাকা। বছরের ব্যবধানে বেতন-ভাতা ও ফি বেড়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৯১৮ টাকা, যা অস্বাভাবিক বলছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
পরিচালকদের ফিও বাড়ানো হয়েছে আকাশ ছোয়া। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে পরিচালকদের ফি এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ২০ হাজার ৪২৭ টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা। বছরের ব্যবধানে তাদের ফি বেড়েছে ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৯২৭ টাকা বা ২৩৭ শতাংশ।
এসব ব্যাপারে উত্তরা ব্যাংকের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নাজমুল হুদা ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, ম্যানেজমেন্ট বেতন, ভাতা, ফি বাড়িয়েছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের। আর ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারে অনেক আগে উত্তরা ব্যাংক বিনিয়োগ করেছে। তখন ‘জেড’ গ্রুপে ছিল না কোম্পানি দুটি।
এখন যেহেতু কোম্পানি দুটি ‘জেড’ গ্রুপে রয়েছে, তাই বর্তমানে কোম্পানি দুটিতে থাকা বিনিয়োগ উত্তরা ব্যাংক উঠিয়ে নেবে কিনা জানতে চাওয়া হলে, তিনি বলেন, বিনিয়োগ উঠিয়ে নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিযোগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি মিজান উর রশিদ চৌধুরী ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকমকে বলেন, শুধু উত্তরা ব্যাংক না, কোনো কোম্পানিরই উচিত না ‘জেড’ গ্রুপের বা ক্যাটাগরির কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের টাকা এভাবে নিম্নমানের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ফেলে রাখা উচিত নয়।
উল্লেখ্য, উত্তরা ব্যাংকের আজ মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) সমাপনী শেয়ার দর ছিল ২১ দশমিক ৫০ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯৭ কোটি ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭২টি, যার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৪২ দশমিক ৯২ শতাংশ, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ২৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিযোগ রয়েছে ০ দশমিক ৯০ শতাংশ।
ডেইলি শেয়ারবাজার ডটকম/টিএ


























Recent Comments